Friday, October 18, 2013

*** "মাতৃদেবো ভব, পিতৃদেবো ভব" :---


মন্ত্রদাতা  ঞ্জানদাতা
তাঁরে  বলি  গুরু,
সদ্‌গুরু  সেই  যাঁহা  হতে
ব্রহ্মদর্শন  শুরু।
স্থিতি  ভেদে  সংঞ্জা  ভেদে
সুকৃতিতে  মিলে
মহাগুরু  মাতাপিতার
জন্ম  হতেই  কোলে।।

পিতা  ও  মাতা  একত্রে  শিব-শিবানী  অর্থাৎ অর্ধনারীশ্বর।

"মাতাপিতাই  শ্রী-শ্রীপতি
উমা  মহেশ্বর, 
মাটির  মূর্ত্তি  ছেড়ে  রে  মন,
তাঁদের  চরণ  ধর।।"


"জগত  পিতরৌ  বন্দে  পার্বতীপরমেশ্বরৌ।
কালিদাসেন  যদুক্তং  পিত্রোস্তদনুভূয়তে।।"

মহাকবি  কালিদাস  তাঁর  রঘুবংশম্‌  নামক  মহাকাব্যে  জগতের আদি মাতাপিতা পার্বতী ও মহেশ্বরকে শব্দ ও অর্থের ন্যায় সংপৃক্ত, নিত্যসম্বন্ধ যুক্ত ('বাগর্থাবিব  সম্পৃক্তৌ') ঞ্জানে  বন্দনা  করেছেন।

মহাকবির ধ্যানদৃষ্টিতে এই রূপটি শাস্ত্রোক্ত অর্ধনারীশ্বরের রূপ। 'অর্ধনারীশ্বরেণ যৎ, আম্নাতং পিতরৌ মম'। দিব্যভূমিতে যিনি অর্ধনারীশ্বর, মর্ত্তভূমিতে তিনিই মাতাপিতারূপে প্রত্যেকের ঘরে ঘরে বিরাজিত।।

মাতা:--- 

'যো  মিমীতে  মানয়তি  সর্বান্‌  জীবান্‌  স  মাতা' ---

দয়াময়  ভগবান  যেমন  সকল  জীবের  সুখ ও উন্নতি কামনা করেন, আমাদের জন্মদাত্রীও তেমনি  নিঃস্বার্থভাবে  নিজ  সন্তানদের সুখ ও শ্রীবৃদ্ধি  কামনা করেন। জননীকে  মাতা  নামে  অভিহিত  করে ঋষিরা বুঝাতে চেয়েছেন যে,মাতা পরমেশ্বরের সমান ইষ্ট ও উপস্যা।

অন্যত্র প্রেমের বিরাম আছে, বাধাও আছে, জগতে মাতৃস্নেহই কেবল অবিরত ও অপ্রতিহত; মৃদুলগামিনী ক্ষুদ্র স্রোতস্বতীর মত মাতৃস্নেহ অবিরলধারে সন্তানের জীবনক্ষেত্রে প্রবাহিত হয়ে নিরন্তর তার মঙ্গল সাধনা করে চলেছে। জগতে মাতৃস্নেহই যথার্থ প্রেম, নিঃস্বার্থ প্রেম, উজ্জ্বল স্পর্শমণি, স্বর্গের অমূল্যরত্ন।

মা-ই জীবন্ত প্রত্যক্ষ দেবী। মায়ের যে যথার্থ রূপ, তা অন্তশ্চক্ষুর গোচর, জড়চক্ষু তার দর্শন পায় না। মায়ের আন্তর দেহ চিন্ময়, স্থূল দেহ তার ছায়া মাত্র। আনন্দ তার মুখ, দয়া তার হস্ত, প্রেম তার কাণ্ড, ধৈর্য ও তিতিক্ষা তার চরণ-কমল।

রক্ত যেমন বক্ষস্থল হতে সঞ্চালিত হয়ে বহুবিধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অবশেষে হস্তপদাদির আকারে আকরিত হয়, মাতৃহৃদয়ের প্রেমও সেইরকম ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন আকার ধারণ করে চিন্ময় মাতৃদেহ নির্মাণ করেছে।

এই চিন্ময়ী মূর্তিই যথার্থ মায়ের মূর্তি --- বাইরের জড়মূর্তি তার প্রতিকৃতি মাত্র! যতক্ষণ এই জড়মূর্তি দেখি, ততক্ষণ প্রকৃত মাতৃদর্শন হয় না। চক্ষুদ্বয় নিমীলিত করে যখন অন্তর-রাজ্যে প্রবেশ করি, তখনই মা প্রত্যক্ষ হ'ন, তাঁর অলোক-সামান্য রূপ দর্শনে প্রাণ পুলকিত হয়, দিব্যঞ্জান লাভ হয়।


"বিদৃতি  সে  মহাদ্বার  ব্রহ্মরন্ধ্র  পাশে
জীবাত্মা-জনমকালে  সহসা  বিকাশে।
জঠরে  প্রবেশি  আত্মা  যুক্ত  প্রাণ-তারে
ওঁ-ওঁ-ওমা-ওমা  স্বতঃই  ঝঙ্কারে।
মাতৃপ্রাণ  হ'তে  রস  টানে  নিজ  প্রাণ  তরে
মাতৃপূজা  মাতৃসেবা  সেই  ঋণ  শুধিবার  তরে।।"

পিতা:---


নমঃ  পিত্রে  জন্মদাত্রে  সর্বদেবময়ায়  চ।
নমঃ  সদাশুতোষায়  শিবরূপায়  তে  নমঃ।।

শিব ও পিতা  দুটি  শব্দই  সমার্থক, দুজনেই  সমান। পিতা = শিব। পিতা  অসীম  শিবেরই  সসীম  রূপ। ঘটাকাশ, গৃহাকাশ এবং মহাকাশে  যেমন  কোন  স্বরূপতঃ প্রভেদ  নেই। একই  আকাশ  ঘট ও গৃহের  সীমায়িত  স্থানে  আবদ্ধ  থাকায়  ঘটাকাশ  গৃহাকাশ  সংঞ্জা দেওয়া  হয়  মাত্র। ঘট  বা  গৃহ  ভগ্ন  করলে  যেমন একই  আকাশ থাকে, তেমনি  অমর্ত্য  শিব  যখন  মর্ত্য  শরীরের  আবেষ্টনীতে  থেকে আমাদের  সামনে  ঘুরে  বেড়ান, তখনই  আমরা  তাঁকে  পিতা  বলি। পিতা  ও  শিবে  স্বরূপতঃ কোন  ভেদ  নেই, পিতাই  শিব।

"তোমার --- তোমার --- আমি  হে  তোমার
--- প্রতি  পরমাণু  কহে  বারবার,
বাবা, তুমিই  আমার  নন্দন-সার
সুন্দর  প্রেমখনি;
কেশ  বেশ  ঢেকে  আসিয়াছ  শিব!
অমৃত-পরশমণি।।"

মাতাপিতার  ধ্যান  পূজা  সেবা  পরিচর্যাই  শ্রেষ্ঠ স্বাধ্যায়, শ্রেষ্ঠ তপস্যা এবং শ্রেষ্ঠ যোগ।

https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191

Wednesday, September 18, 2013


" জ্যোতির  মাঝে  শ্রেষ্ঠ  জ্যোতি  নামল  উষা  ঐ  গগনে,
বিচিত্রতার  দীপ্ত  কিরণ  ছড়িয়ে  পড়ে  সব  ভুবনে।
সবিতা  সে  অন্তকালে  জাগায়  তিমির  রজনীরে,
দ্যুতিমতী  উষায়  তথা  রাত্রি  জাগায়  ধীরে  ধীরে।।

শুভ্র  বরণ  দীপ্ত  মোহন  উষা  এল  সূর্যসনে,
কৃষ্ণবর্ণা  রাত্রি  পালায়  তিমিরঘেরা  নিজসদনে।
রাত্রি  উষা  অমৃতময়  সূর্যসখা  তারা  দোঁহে,
একের  বরণ  অন্যে  নাশে  দীপ্ত  হয়ে  জগৎ  মোহে।।

অনন্ত  পথ  উভয়  বোনের  বিধান  করেন  দেবতারা,
সেথায়  নিত্য  ভ্রমণ  করে  একের  পরে  অন্য  তারা।।
ভিন্নরূপা  নক্ত  উষা  চিত্ত  তাদের  সমান  তবু,
দেয়  না  বাধা  পরস্পরে  চুপটি  করে  রয়না  কভু।।

সুনৃত  বাক  তারই  দেওয়া  প্রভাময়ী  জানি  তারা,
চিত্র  তিনি  খোলেন  দ্বারে  তিমির  ভরা  অন্ধকারে।
সর্বজগত  আলোয়  ভরি  প্রকাশ  করি  দিলেন  ধনে,
জাগিয়ে  দিলেন  জ্যোতির্ছটায়  বিশ্ববাসী  সকল  জনে।।

বক্র  হয়ে  ছিল  শুয়ে  উষা  তাদের  দিলেন  ডাকি,
কেউ বা  যাগে  কেউ  বা  ভোগে  কেউ  বা  কাজে  মাতল  হাঁকি।
উষা  তাদের  দৃষ্টি  বাড়ায়  অল্প  যারা  দেখতে  পারে,
দীপ্ত  উষা  জাগান  হেসে  বিশ্বজগৎ  পারাবারে।।

কেউ  বা  জাগে  ধনের  লাগি  কেউ  বা  জাগে  অন্ন  তরে,
কেউ  বা  জাগে  যঞ্জ  তরে  কেউ  বা  ইষ্ট  যাচ্ঞা  করে।
প্রকাশ  করেন  বিশ্বভুবন  বিশ্বজনের  হিতের  লাগি,
চলেন  সবাই  আপন  কাজে  তন্দ্রা  হতে  ভোরে  জাগি।।"





Monday, September 2, 2013

"সাধু হো তো য়্যাসা" ---


কামরূপে মঠে স্বামী কেবলানন্দ নামে এক সন্ন্যাসী থাকতেন।কন্দর্পকান্তি দেহ, শালপ্রাংশু মহাভুজ, বয়স ৩০/৩২ এর বেশী হবে না।সবসময় ধ্যানানন্দে বিভোর থাকতেন।রাত্রি ৩টে স্বামীজীর সঙ্গে গঙ্গাস্নানে,বেলা ১২টা,১টার সময় মাধুকরী করতে যাওয়া ছাড়া তিনি গুম্ফার বাইরে বেরুতেন না।ব্রহ্মচারী মহেশ চৈতন্য নামে মঠের একজন ব্রহ্মচারী একবার স্বামীজীর কাছে এসে অভিযোগ করলো -'স্বামীজী,কেবলানন্দজী মাধুকরী করতে বেরিয়ে নারদ ঘাটের এক শেঠানীর বাড়ীতে গিয়ে রোজ মাধুকরী করে।খোঁজ নিয়েছি ঐ বাড়ীতে ৪৫/৪৬ উমরকা এক বিধবা শেঠানী থাকে আর কেউ থাকে না। হমারা ডর হ্যায়, 'ইসমে মঠকা কৌঈ বদনামী না হো'। 

মহেশ চৈতন্যের এই অভিযোগ শুনে স্বামীজী সঙ্গে সঙ্গে কেবলানন্দজীকে উপরে ডেকে পাঠালেন। মহেশ চৈতন্যের অভিযোগ সত্য কিনা জিঞ্জেস করলেন।


কেবলানন্দজী অবিচল কণ্ঠে বললেন - সিকায়ৎ সচ হ্যায়।উনোনে হামারা বড়া বহিন হ্যায়।স্বামীজী ছোটবেলা আমি মা বাপকে হারিয়েছি।ঐ বহিনজীই আমাকে মানুষ করেছিলেন। আমি সংসার ত্যাগের পর বহিনজীও কাশীতে এসে বাস করছেন, জপ পূজার মধ্যেই সময় কাটান। আমি যে কাশীতে থাকি তা তিনি জানতেন না। আজও জানেন না আমি এই মঠে আপনার চরণাশ্রয়ে থাকি।


একদিন মাধুকরী করতে গিয়ে হঠাৎ বিশ্বনাথের গলিতে দেখা হয়ে যায়। তিনি বিশ্বনাথের পূজা করে ফিরেছিলেন। ভীষণ কান্নাকাটি করেন। রাস্তার মধ্যেই তিনি মূর্চ্ছা যান। সংঞ্জা ফিরে পেয়ে বলেন -তোকে কোথাও না কোথাও তো মাধুকরী করতেই হয়। তুই আমার কাছে মাধুকরী করবি বলে গঙ্গাজল, বিশ্বনাথের নির্মাল্য নিয়ে শপথ করান।


স্বামীজী আমি অপরাধী, মায়া মমতার ডোর আমার মধ্যে সুপ্ত ছিল।আমার গোস্তাকী হয়েছে, আপনাকে সব নিবেদন করা উচিত ছিল।মহেশ চৈতন্যকে সঙ্গে দিয়ে স্বামীজী আর এক ব্রহ্মচারীকে সব বৃত্তান্তের খোঁজ নিতে পাঠালেন। সেই ব্রহ্মচারী সব খোঁজ নিয়ে এসে স্বামীজীকে বললেন, কেবলানন্দজীর কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য।


স্বামীজী কেবলানন্দজীকে বললেন - ভগবন্! কলিতে সন্ন্যাস ধর্মকে বড় কঠিনতম ব্রত বলে। বিরজা হোমের সময় বাইরের জগৎ আর তার হাতছানি রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শকেও যেমন ন্যাস করতে হয় তেমনি অন্তর জগতের যোগজ শক্তি বিভূতি ইত্যাদিকেও ন্যাস করতে হয়। পূর্বাশ্রমকে ভুলতে হয়, এমনভাবে ভুলতে হয় যে, যেন নিথর রহস্য ঢাকা পড়ে যায়। নিজেকে মৃতঞ্জানে সন্ন্যাসী নিজেরই শ্রাদ্ধ করেন গৈরিক বস্ত্র গ্রহণের পূর্বে। এটা অনুমান করলে চলবে না, সত্যি সেইরকম জীবন্ত বোধটি হওয়া চাই।


এই মঠের আচার্যরা এইভাবে কঠোরতম তপস্যা ও কৃচ্ছসাধনের দ্বারা পবিত্রতম সন্ন্যাস ধর্মের জ্যোতিকে জ্বালিয়ে রেখে গেছেন। আমার মত অপদার্থ এর আগে কেউ এই মহান মঠে বসেনি। কিন্তু আমার বল বুদ্ধি ভরসা তো তোমরা। তোমাদের মুখ চেয়েই সেই ব্রহ্মবিদ্বরিষ্ঠ আচার্যদের ব্রত পালনের ভার নিয়েছি। তোমারা যদি সাহায্য না কর, সহয়তা না কর তাহলে সন্ন্যাস ধর্ম কি করে থাকবে ভগবান? তুমি বলে দাও বাছা, তোমার ঐ কাজ সন্ন্যাস ধর্মের অনুকূল কিনা? আমি তো মুখ্যু সুখ্যু মানুষ বাবা।


কেবলানন্দজী দণ্ড,কমণ্ডলু এবং তাঁর গৈরিক উত্তরীয়খানি স্বামীজীর পদতলে রেখে বললেন -- এই শরীরের পাতিত্য দোষ ঘটেছে প্রভু!পূর্বাশ্রমের সঙ্গে কোন সংস্পর্শ রাখা কোন সন্ন্যাসীর উচিত নয়। আমি সন্ন্যাস ধর্মের অমর্যাদা করেছি। তাই ভাবছি--এখন উত্তরায়ণ চলছে,আগামীকাল সকাল ৮টায় এই অশুদ্ধ দেহটা ফেলে দেব।উপস্থিত সকলেই হতচকিত। কিন্তু ভোলানন্দজী নির্বিকার। 

ভোলানন্দজী ধীর স্থির ভাবে তখনই কামরূপ মঠের স্বীকৃত ৫ জন সাগ্নিক ব্রাহ্মণকে পরদিন প্রাত:কালে উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে এক সাধুকে পাঠালেন আর এরপরই বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে ব্রহ্মচারী মহেশকে মঠ ছেড়ে যাবার নির্দেশ দিলেন। 

ভোর ৪টে কামরূপ মঠে উপস্থিত হলেন একে একে পাঁচজন সাগ্নিক ব্রাহ্মণ -- গোপীনাথ কবিরাজ,মঙ্গলদেব শাস্ত্রী,পণ্ডিত তারাকিশোর, ব্রহ্মদত্ত জিঞ্জাসু এবং ছোট বামাচরণ। 

কেবলানন্দজী নিজে হোমকুণ্ড সাজাচ্ছেন। পাঁচজন ব্রাহ্মণের জন্য পাঁচটি আসন পাতা আছে। কেবলানন্দজী তাঁদের "নম নারায়ণায়" জানিয়ে আসন গ্রহণের অনুরোধ জানালেন। যথাসময়ে যথালগ্নে শুরু হল বিরজা হোম। পাঁচজনে একত্রে উচ্চারণ করতে লাগলেন অগ্নি প্রজ্জ্বলনের মন্ত্র --- কেবলানন্দজী ধ্যানস্থ - নিথর নিস্পন্দ দেহ। 

"হরি ওঁ তৎসৎ, হরি ওঁ তৎসৎ" উচ্চারণ করতে করতে ভোলানন্দজী নেমে এলেন। কেবলানন্দজীর মাথায় দণ্ড স্পর্শ করে মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগলেন। 

বদ্ধ পদ্মাসনে ঋজু আয়তদেহে উন্নত মেরুদণ্ডে উপবিষ্ট সিদ্ধতাপস কেবলানন্দজীর ব্রহ্মরন্ধ্র দিয়ে একটি উজ্জ্বল শিখা উর্ধাকাশে গিয়ে মিলিয়ে গেল। হোমকুণ্ডের সামনে পড়ে রইল "পাতিত্য দোষে দুষ্ট" কেবলানন্দজীর অশুদ্ধ দেহ!


www.ananda-tapobhuminarmada.blogspot.com


Monday, August 12, 2013


"হে  নাথ!  অবঞ্জা  করি  যেও  নাকো  ফিরে,
আমার  এ  ধূলিস্তূপ  খেলাঘর  দেখে।
খেলাঘরে  শুনিতে  পেয়েছি  থেকে  থেকে  যে  চরণ-ধ্বনি
জগতের  প্রতি  বস্তু  মাঝে  যে  সঙ্গীত  রাজে
তাই  যেন  নিত্যকাল  শুনি।"

"জীবনের  ক্লেদ  গ্লানি  যাক্‌  ডুবে  অনন্ত  পাথারে
সুখ  দুঃখ  মৃত্যুভয়  যাক্‌  ভেসে  দূর  দূরান্তরে
তোমার  পরশে  হল  বোধির  বোধন
প্রঞ্জার  প্রকাশ  হল  রসঘন  আনন্দ  দীপন
হে  ব্রহ্মর্ষি, তব  পদে  নমি  বারংবার।"



Tuesday, July 23, 2013


মিত্রদ্রোহিতা, বন্ধু  হয়ে  বন্ধুর  সঙ্গে  ছলনা, ব্রহ্ম হত্যার  মত অতি ঘৃণ্য পাপ। ভারতীয় সংস্কৃতির শিক্ষা হল -


মিত্রদ্রোহী  কৃতঘ্নশ্চ  যে  নরাঃ  বিশ্বাসঘাতকাঃ।
তে  নরাঃ  নরকং  যান্তি  যাবচ্চন্দ্রদিবাকরৌ।।

মিত্রদ্রোহী, কৃতঘ্ন  এবং  বিশ্বাসঘাতক --- এই  তিন  প্রকৃতির  লোকই হল  প্রকৃত  চিহ্নিত  পাপিষ্ঠ। যতদিন  আকাশে  চন্দ্র, সূর্য  থাকবেন, ততকাল ঐ  তিন  প্রকৃতির পাপিষ্ঠকে  নরক  যন্ত্রণা  ভোগ করতে হবে। বন্ধুর  বিরুদ্ধাচারণ  করতে  নেই। মত  ও  আদর্শে  যদি কোনদিন উভয়ের  মধ্যে  পার্থক্য  দেখা  দেয়, সসম্মানে  দূরে  সরে থাকাই  ভাল, তবুও  তার  কোনদিন  অনিষ্ট  করতে নেই। উপকারীর উপকার  স্মরণে  না  রাখলে  কিংবা  প্রত্যুপকারের পরিবর্তে  তার  কোনদিন  অপকার  করার  প্রবৃত্তি  জন্মালে, তার নাম  কৃতঘ্নতা। এটি  একটি  মহাপাপ।  কেউ  বিশ্বাস  করে  কোন গোপন কথা  বললে  বা  বিশ্বাস  করে   কোন  দ্রব্য  জমা  রাখলে, প্রাণপন  চেষ্টায়  মন্ত্রগুপ্তির  মত  সেই  বিশ্বাস  রক্ষা  করা  উচিত।


https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191

Monday, July 15, 2013


প্রাণায়াম:--- প্রাণায়ামে  আয়ু  বাড়ে  কিন্তু  প্রাণায়াম  বলতে ভারতবর্ষের  তাবৎ  লোক  যা  বুঝে  থাকেন  সেই  শ্বাস  প্রশ্বাসের ক্রিয়ার  দ্বারা  আয়ু  বাড়ে  না।  বরং  রোগবৃদ্ধি  হয়, স্বাস্থ্যের হানি ঘটে। মানুষের শরীর কামারশালার  ভস্ত্রা  নয়।কাজেই রেচক পূরক কুম্ভকের নামে  শ্বাস প্রশ্বাসের  কসরৎকে প্রাণায়াম বলে না।"প্রাণায়াম" শব্দটির  অর্থ --- প্রাণের  অয়মন  বা  বিস্তার। সত্যকার প্রাণায়াম  প্রাণঘাতী  নয়। প্রাণায়ামকে  শ্রেষ্ঠ  তপস্যা বলে বর্ণনা করা  হয়েছে। প্রাণায়ামে  সত্য সত্যই  চিত্তবৃত্তির  বিরাম ঘটে।

ভগবান  পতঞ্জলির  মতে  প্রাণায়াম  রূপ  যোগাঙ্গের  অনুষ্ঠানে অশুদ্ধি  ক্ষয়  হয়, অশুদ্ধি  ক্ষয়  হলে  বিবেকখ্যাতি পর্য্যন্ত  ঞ্জানদীপ্তি হয়ে  থাকে।


ভগবান  মনু  বলেছেন  অগ্নিতে  দগ্ধ  করলে  যেমন  সুবর্ণাদি ধাতুর 
মল  নষ্ট  হওয়ায়  তা  শুদ্ধ ও উজ্জ্বলতর  হয়, তেমনি প্রাণায়াম করলে  মন  প্রভৃতি  ইন্দ্রিয়কৃত  দোষ  নষ্ট  হয়।

বেদ এবং পাণিনি  মতে প্রকৃত প্রাণায়াম  হল 'বিচ্ছর্দনাভ্যাম্‌' এ এক রকমের  বমন  ক্রিয়া ---  উদ্ধৃত্ত  কফ-বায়ুপিণ্ডের  বমন, তমোগুণের বমন, বিষয়লিপ্সার  বমন,  কামনার  বমন  এবং যুগপৎ ব্রাহ্মীস্থিতি। এই  গুপ্ত  পদ্ধতি  গুরুমুখগম্য।

পরিণাম:--- ১৯৪৭  সালে  পূজার  ছুটিতে  এলাহাবাদ  গিয়েছিলাম। ত্রিবেণী  তটস্থ  বাঁধের  পূর্বদিকে  হাড়োয়া  বাবা  নামে এক হঠযোগী বাস  করতেন। বাঁধের  পশ্চিম  দিকে  থাকতেন  সুদত পুরী  নামে আর  এক  সাধু, তিনিও  হঠযোগী। সকাল  ও  সন্ধ্যায় দলে  দলে লোকে  আসতেন  তাঁদের  আশ্রমে।

সুদত  পুরীকে  সবাই  বলতেন 'আসন  সিদ্ধ', হাড়োয়া  বাবাকে বলতেন --- 'প্রাণায়াম সিদ্ধ'। সুদত  পুরীর  শিষ্যরা  প্রচার  করতেন যে  আকাশগমনাদি  ব্যাপার  তাঁদের  গুরুর  কাছে  নিতান্ত ছেলেখেলা  বিশেষ। যদি  কাউকে  জিঞ্জেস  করতাম, 'আপনি  কি নিজের  চোখে  এ  সব  দেখেছেন?' উত্তর  পেতাম --- ' অমুকের কাছে শুনেছি, উনোনে  বোলা...'। সেই  'অমুককে' খুঁজে  জিঞ্জেস করলে তিনি  জবাব  দিতেন --- 'তমুকের  কাছে  শুনেছি, তমুক  খুদ্‌ আঁখসে দেখা  হ্যায়।' এই  অমুক  তমুকরা  ধর্মজগতে  সাধুবাবাদের আদি  ও অকৃত্রিম  প্রচারক। তাঁদের  কথা  সকলের কানে  ভেসে আসে, তাঁদের কেউ  দেখা  পায়  না, আমিও পাই  নি।

দুই  সাধু  বাবারই খ্যাতি  তখন  তুঙ্গে। যোগাভ্যাসীদের 'জয় বজরংবলী'  ধ্বনিতে  উভয়ের  আশ্রম  মুখর থাকত। যে কোন ভাবে হোক, আমার  উপর  হাড়োয়া  বাবার বিশেষ কৃপাদৃষ্টি পড়েছিল। তিনি  তাঁর  আশ্রমের  একটি  কুটিরেই আমাকে থাকতে দিয়েছিলেন। যখনই  এলাহাবাদ  যেতাম, তাঁর কুটীরেই থাকতাম।

দেখতাম  যোগাভ্যাসীরা  সুদত  পুরীজীর  আশ্রমে  ব্রজাসন,ময়ূরাসন, কাকাসন, পরশুরামাসন, মৎস্যেন্দ্রাসন, শাম্ভবী, যোনিমুদ্রা, জালবন্ধমুদ্রা, মহামুদ্রা  প্রভৃতি  অভ্যাস  করতেন। তাঁরাই  আবার হাড়োয়া  বাবার  আশ্রমে  এসে  অভ্যাস  করতেন উজ্জায়ী, ভস্ত্রায়ী, কেবলী  প্রভৃতি  প্রাণায়ামবিধি। অনেকে  আবার খেচরী  সিদ্ধ হওয়ার বাসনায়  জিহ্বার  ছেদন  দোহনাদি  ক্রিয়া একনিষ্ঠভাবে অভ্যাস করতেন।

হাড়োয়া  বাবার  এক  শিষ্য, বিষ্ণুদেবানন্দ  পুরী  বাঁধের  নীচে  এক বিরাট  গর্ত  করে  তার  মধ্যে  থেকে 'গুহাসাধনা  করতেন। জমজমাট  ব্যাপার, চারদিকে  শুধু  'যোগীপুরুষের' ভীড়!  সুদত পুরী একদিন  গুহ্যদ্বার  দিয়ে  নাড়ীভুঁড়ি  বের  করে দেখিয়েছিলেন। একদিন  হুঙ্কার  দিয়ে  শাল প্রাংশু  মহাভুজ  হাড়োয়া  বাবা যোগাসনে বসলেন ---  সঙ্গে  সঙ্গে  শিবনেত্র। দৃষ্টি  স্থির। আধঘণ্টা পরে  ডাক্তার স্টেথোস্কোপ  দিয়ে  পরীক্ষা  করে  বললেন, বুকের মধ্যে  কোন স্পন্দন  নেই, নাড়ীর  গতিও  রুদ্ধ। তাঁর  বুকে  হাত দিয়ে দেখেছিলাম  হৃদপিণ্ডে  সত্যই  কোন  স্পন্দন  ছিল  না। দু'ঘণ্টা  পরে হাড়োয়া  বাবা  চোখে  মেলে  তাকালেন।

যোগের  নামে  নানাবিধ  কসরৎ ও ভোজবাজীতে  সিদ্ধপীর  এই যোগীবরের  প্রাত্যহিক  জীবনচর্চা  আমার  চোখে  মহাপুরুষোচিত বলে  মনে  হয়  নি। "ঐ  সকল  আসন  ও  প্রাণায়ামে  কি চিত্তবৃত্তির নাশ  হয়? আসন ও প্রাণায়ামে  এত  নৈপুণ্য  সত্ত্বেও  জীবনধারাতে ইন্দ্রিয়  জয়ের  চিহ্ন  কেন  পরিলক্ষিত  হয়  না? যে সব  যোগ প্রণালীতে  প্রঞ্জা  স্ফুরণের  কোন  লক্ষণ  দেখা  যায়  না, তা  কি যোগ পদবাচ্য?"------ এবম্বিধ  প্রশ্নজালে  জর্জরিত  হয়ে  হাড়োয়া বাবা আমার  উপর  বিষম  ক্রুদ্ধ  হন।

কয়েক  বৎসর  পরে  কুম্ভমেলাতে  গিয়ে  শুনলাম, 'গুহাসাধনার ফলে বিষ্ণুদেবানন্দ  বদ্ধ  উন্মাদ  হয়ে  যায়, সংবাদ  পেয়ে  তার আত্মীয় স্বজন  এসে  তাকে  রাঁচির  পাগলা  গারদে  রেখে  এসেছেন।গুহ্যদ্বারের  পথে  নাড়ীভুঁড়ি  নিষ্কাশনের  কসরৎ  দেখাতে  গিয়ে আন্ত্রিক রক্তক্ষরণের ফলে  সুদত পুরীজী  কালগ্রাসে পতিত হয়েছেন। 
হাড়োয়া  বাবার  আশ্রমে  গিয়ে  দেখলাম  তাঁর  অন্তিম  দশা আগত প্রায়। হায়? তাঁর  সেই  বিশাল  'যোগসিদ্ধ' দেহের এ কী অবস্থা! উৎকট  হাঁপানী  রোগে  তাঁর  দেহ  কঙ্কালসার। হাঁফের  টানে  এক একবার  মনে  হতে  লাগল  তাঁর  চোখ  দুটো  যেন  ঠিকরে  বেরিয়ে আসবে! দমকে  দমকে  কাশি, কাশির  টান  কমলেই  ক্ষীণকণ্ঠে বলে চলেছেন  'হাঃ  প্রাণায়াম!  প্রাণ  গয়া  রাম!' কোথায়  গেল  সেই 'জয় বজরংবলী'  হুঙ্কার আর  অট্টনাদ। একী  শোচনীয়  দশা! ইঙ্গিতে  কাছে ডেকে  আমাকে বললেন --- 'সচ  কহু, ইস  প্রাণায়াম বেগারমেঁ  ঞ্জান কা  প্রাপ্তি  নাহি  হোতি। হাঃ  প্রাণায়াম। প্রাণ  গয়া রাম। হাড়োয়া বাবা  সাধুপুরুষ  সন্দেহ নাই।

কলিকাতায়  ফিরে  আসার  কিছুদিন  পরেই  হাড়োয়া  বাবার মৃত্যুসংবাদ  পাই।



https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191

Tuesday, June 18, 2013


প্রায়  সাধু-সন্ন্যাসী  থেকে  গৃহী  সবাইকে  বলতে  শুনি---- আমি  নিত্য  গুরুর  নির্দিষ্ট  পন্থায়  সাধন-ভজন  করি, নিত্য  ধ্যান  করি, দৈবী  অনুভূতির  আশায়  বিভিন্ন  ধর্মস্থানে  ঘুরে  বেড়াই, গুরুকে  ভালবাসি, ইষ্টকে  ভালবাসি। কিন্তু  কাজের  কাজ  কিছুই  হচ্ছে  না। কারণ  "ভালবাসি" অর্থাৎ অহং  এই  কথাটা  দগ্‌দগে  ঘায়ের  মত  মনের  মণিকোঠায়  থেকে  যায়। কারণ "ভালবাসি"র  মধ্যে  আমি  থাকে, থাকে  মায়া, থাকে  লোভ। তাই "ভালবাসি"র  ফুল  বাসি  হয়ে  যায়। ফুল  তুললে, মালা  গাঁথলে, গলায়  পরলে, ঠাকুর  সাজালে  তারপর  প্রয়োজন  ফুরালেই 'বাসি'  ফুল  ফেলে  দিতে  হয়। ভালবাসা  রূপ 'বাসি' ফুলে কি  মৌমাছি  বসবে!  না  গুণ্‌গুণ্‌  করবে!  মধু  জমবে  কোথা  থেকে? তাই  ভালবাসার  জন্য  ভাললাগা  ভাল। তাতে  কি  হচ্ছে  আর  হচ্ছে  না, তার  হিসাব  থাকে  না। যে  বাসায়  ভালবাসা  থাকে  সেখানেই  ত  বাস  প্রেমের  ঠাকুর  মদনমোহনের। ভালবাসাই  ভগবান।

আমি-হীন, মায়া-হীন, লোভ-হীন  প্রকৃত  ভালবাসা  যাঁর  হয়  মহাকালের  সেই  মন্দিরা  তখনই  বাজে---- সুখে  বাজে, দুঃখে  বাজে, ফুলে  বাজে, কাঁটায়  বাজে! আলো-ছায়ায়, জোয়ার ভাঁটায়, ভালয়  মন্দয়,  আশা ও শঙ্কার  মধ্যে  বেজে  চলেছে, তাঁর  নিত্যকালের  ডমরু! তিনি  দয়ার  সাগর। তিনি  মন্দিরে  থাকুন  বা  না  থাকুন  তাঁর  সর্বব্যপ্ত  বিরাট  স্বরূপের  অনুধ্যানই  আসল।


অহংতা  চুরি, অহং  চামারি, অহং  নীচেন  কি  নীচ।
অহং  না  হোতি  বিচমে  তো  সাক্ষাৎ  থে  ঈশ।।

অর্থাৎ  অহংকার  চৌর্যাপরাধের  মত  জঘন্য  অপরাধ। অহংকার-বৃত্তি  মেথরাণী  বা  চণ্ডালিনীর  মত  নীচ। জীব ও  ব্রহ্মের  মধ্যে  দুর্লঙঘ্য  বাধা  স্বরূপ  এই  অহং। এই  অহং  না  থাকলে  জীব  সহজেই অনুভব  করতে  পারত  যে  সে  স্বয়ং  ব্রহ্ম  স্বরূপ। 
তখনই  তাঁর  ইষ্ট  বস্তু  লাভ  সহজ  হয়।


https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191