Tuesday, July 23, 2013


মিত্রদ্রোহিতা, বন্ধু  হয়ে  বন্ধুর  সঙ্গে  ছলনা, ব্রহ্ম হত্যার  মত অতি ঘৃণ্য পাপ। ভারতীয় সংস্কৃতির শিক্ষা হল -


মিত্রদ্রোহী  কৃতঘ্নশ্চ  যে  নরাঃ  বিশ্বাসঘাতকাঃ।
তে  নরাঃ  নরকং  যান্তি  যাবচ্চন্দ্রদিবাকরৌ।।

মিত্রদ্রোহী, কৃতঘ্ন  এবং  বিশ্বাসঘাতক --- এই  তিন  প্রকৃতির  লোকই হল  প্রকৃত  চিহ্নিত  পাপিষ্ঠ। যতদিন  আকাশে  চন্দ্র, সূর্য  থাকবেন, ততকাল ঐ  তিন  প্রকৃতির পাপিষ্ঠকে  নরক  যন্ত্রণা  ভোগ করতে হবে। বন্ধুর  বিরুদ্ধাচারণ  করতে  নেই। মত  ও  আদর্শে  যদি কোনদিন উভয়ের  মধ্যে  পার্থক্য  দেখা  দেয়, সসম্মানে  দূরে  সরে থাকাই  ভাল, তবুও  তার  কোনদিন  অনিষ্ট  করতে নেই। উপকারীর উপকার  স্মরণে  না  রাখলে  কিংবা  প্রত্যুপকারের পরিবর্তে  তার  কোনদিন  অপকার  করার  প্রবৃত্তি  জন্মালে, তার নাম  কৃতঘ্নতা। এটি  একটি  মহাপাপ।  কেউ  বিশ্বাস  করে  কোন গোপন কথা  বললে  বা  বিশ্বাস  করে   কোন  দ্রব্য  জমা  রাখলে, প্রাণপন  চেষ্টায়  মন্ত্রগুপ্তির  মত  সেই  বিশ্বাস  রক্ষা  করা  উচিত।


https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191

Monday, July 15, 2013


প্রাণায়াম:--- প্রাণায়ামে  আয়ু  বাড়ে  কিন্তু  প্রাণায়াম  বলতে ভারতবর্ষের  তাবৎ  লোক  যা  বুঝে  থাকেন  সেই  শ্বাস  প্রশ্বাসের ক্রিয়ার  দ্বারা  আয়ু  বাড়ে  না।  বরং  রোগবৃদ্ধি  হয়, স্বাস্থ্যের হানি ঘটে। মানুষের শরীর কামারশালার  ভস্ত্রা  নয়।কাজেই রেচক পূরক কুম্ভকের নামে  শ্বাস প্রশ্বাসের  কসরৎকে প্রাণায়াম বলে না।"প্রাণায়াম" শব্দটির  অর্থ --- প্রাণের  অয়মন  বা  বিস্তার। সত্যকার প্রাণায়াম  প্রাণঘাতী  নয়। প্রাণায়ামকে  শ্রেষ্ঠ  তপস্যা বলে বর্ণনা করা  হয়েছে। প্রাণায়ামে  সত্য সত্যই  চিত্তবৃত্তির  বিরাম ঘটে।

ভগবান  পতঞ্জলির  মতে  প্রাণায়াম  রূপ  যোগাঙ্গের  অনুষ্ঠানে অশুদ্ধি  ক্ষয়  হয়, অশুদ্ধি  ক্ষয়  হলে  বিবেকখ্যাতি পর্য্যন্ত  ঞ্জানদীপ্তি হয়ে  থাকে।


ভগবান  মনু  বলেছেন  অগ্নিতে  দগ্ধ  করলে  যেমন  সুবর্ণাদি ধাতুর 
মল  নষ্ট  হওয়ায়  তা  শুদ্ধ ও উজ্জ্বলতর  হয়, তেমনি প্রাণায়াম করলে  মন  প্রভৃতি  ইন্দ্রিয়কৃত  দোষ  নষ্ট  হয়।

বেদ এবং পাণিনি  মতে প্রকৃত প্রাণায়াম  হল 'বিচ্ছর্দনাভ্যাম্‌' এ এক রকমের  বমন  ক্রিয়া ---  উদ্ধৃত্ত  কফ-বায়ুপিণ্ডের  বমন, তমোগুণের বমন, বিষয়লিপ্সার  বমন,  কামনার  বমন  এবং যুগপৎ ব্রাহ্মীস্থিতি। এই  গুপ্ত  পদ্ধতি  গুরুমুখগম্য।

পরিণাম:--- ১৯৪৭  সালে  পূজার  ছুটিতে  এলাহাবাদ  গিয়েছিলাম। ত্রিবেণী  তটস্থ  বাঁধের  পূর্বদিকে  হাড়োয়া  বাবা  নামে এক হঠযোগী বাস  করতেন। বাঁধের  পশ্চিম  দিকে  থাকতেন  সুদত পুরী  নামে আর  এক  সাধু, তিনিও  হঠযোগী। সকাল  ও  সন্ধ্যায় দলে  দলে লোকে  আসতেন  তাঁদের  আশ্রমে।

সুদত  পুরীকে  সবাই  বলতেন 'আসন  সিদ্ধ', হাড়োয়া  বাবাকে বলতেন --- 'প্রাণায়াম সিদ্ধ'। সুদত  পুরীর  শিষ্যরা  প্রচার  করতেন যে  আকাশগমনাদি  ব্যাপার  তাঁদের  গুরুর  কাছে  নিতান্ত ছেলেখেলা  বিশেষ। যদি  কাউকে  জিঞ্জেস  করতাম, 'আপনি  কি নিজের  চোখে  এ  সব  দেখেছেন?' উত্তর  পেতাম --- ' অমুকের কাছে শুনেছি, উনোনে  বোলা...'। সেই  'অমুককে' খুঁজে  জিঞ্জেস করলে তিনি  জবাব  দিতেন --- 'তমুকের  কাছে  শুনেছি, তমুক  খুদ্‌ আঁখসে দেখা  হ্যায়।' এই  অমুক  তমুকরা  ধর্মজগতে  সাধুবাবাদের আদি  ও অকৃত্রিম  প্রচারক। তাঁদের  কথা  সকলের কানে  ভেসে আসে, তাঁদের কেউ  দেখা  পায়  না, আমিও পাই  নি।

দুই  সাধু  বাবারই খ্যাতি  তখন  তুঙ্গে। যোগাভ্যাসীদের 'জয় বজরংবলী'  ধ্বনিতে  উভয়ের  আশ্রম  মুখর থাকত। যে কোন ভাবে হোক, আমার  উপর  হাড়োয়া  বাবার বিশেষ কৃপাদৃষ্টি পড়েছিল। তিনি  তাঁর  আশ্রমের  একটি  কুটিরেই আমাকে থাকতে দিয়েছিলেন। যখনই  এলাহাবাদ  যেতাম, তাঁর কুটীরেই থাকতাম।

দেখতাম  যোগাভ্যাসীরা  সুদত  পুরীজীর  আশ্রমে  ব্রজাসন,ময়ূরাসন, কাকাসন, পরশুরামাসন, মৎস্যেন্দ্রাসন, শাম্ভবী, যোনিমুদ্রা, জালবন্ধমুদ্রা, মহামুদ্রা  প্রভৃতি  অভ্যাস  করতেন। তাঁরাই  আবার হাড়োয়া  বাবার  আশ্রমে  এসে  অভ্যাস  করতেন উজ্জায়ী, ভস্ত্রায়ী, কেবলী  প্রভৃতি  প্রাণায়ামবিধি। অনেকে  আবার খেচরী  সিদ্ধ হওয়ার বাসনায়  জিহ্বার  ছেদন  দোহনাদি  ক্রিয়া একনিষ্ঠভাবে অভ্যাস করতেন।

হাড়োয়া  বাবার  এক  শিষ্য, বিষ্ণুদেবানন্দ  পুরী  বাঁধের  নীচে  এক বিরাট  গর্ত  করে  তার  মধ্যে  থেকে 'গুহাসাধনা  করতেন। জমজমাট  ব্যাপার, চারদিকে  শুধু  'যোগীপুরুষের' ভীড়!  সুদত পুরী একদিন  গুহ্যদ্বার  দিয়ে  নাড়ীভুঁড়ি  বের  করে দেখিয়েছিলেন। একদিন  হুঙ্কার  দিয়ে  শাল প্রাংশু  মহাভুজ  হাড়োয়া  বাবা যোগাসনে বসলেন ---  সঙ্গে  সঙ্গে  শিবনেত্র। দৃষ্টি  স্থির। আধঘণ্টা পরে  ডাক্তার স্টেথোস্কোপ  দিয়ে  পরীক্ষা  করে  বললেন, বুকের মধ্যে  কোন স্পন্দন  নেই, নাড়ীর  গতিও  রুদ্ধ। তাঁর  বুকে  হাত দিয়ে দেখেছিলাম  হৃদপিণ্ডে  সত্যই  কোন  স্পন্দন  ছিল  না। দু'ঘণ্টা  পরে হাড়োয়া  বাবা  চোখে  মেলে  তাকালেন।

যোগের  নামে  নানাবিধ  কসরৎ ও ভোজবাজীতে  সিদ্ধপীর  এই যোগীবরের  প্রাত্যহিক  জীবনচর্চা  আমার  চোখে  মহাপুরুষোচিত বলে  মনে  হয়  নি। "ঐ  সকল  আসন  ও  প্রাণায়ামে  কি চিত্তবৃত্তির নাশ  হয়? আসন ও প্রাণায়ামে  এত  নৈপুণ্য  সত্ত্বেও  জীবনধারাতে ইন্দ্রিয়  জয়ের  চিহ্ন  কেন  পরিলক্ষিত  হয়  না? যে সব  যোগ প্রণালীতে  প্রঞ্জা  স্ফুরণের  কোন  লক্ষণ  দেখা  যায়  না, তা  কি যোগ পদবাচ্য?"------ এবম্বিধ  প্রশ্নজালে  জর্জরিত  হয়ে  হাড়োয়া বাবা আমার  উপর  বিষম  ক্রুদ্ধ  হন।

কয়েক  বৎসর  পরে  কুম্ভমেলাতে  গিয়ে  শুনলাম, 'গুহাসাধনার ফলে বিষ্ণুদেবানন্দ  বদ্ধ  উন্মাদ  হয়ে  যায়, সংবাদ  পেয়ে  তার আত্মীয় স্বজন  এসে  তাকে  রাঁচির  পাগলা  গারদে  রেখে  এসেছেন।গুহ্যদ্বারের  পথে  নাড়ীভুঁড়ি  নিষ্কাশনের  কসরৎ  দেখাতে  গিয়ে আন্ত্রিক রক্তক্ষরণের ফলে  সুদত পুরীজী  কালগ্রাসে পতিত হয়েছেন। 
হাড়োয়া  বাবার  আশ্রমে  গিয়ে  দেখলাম  তাঁর  অন্তিম  দশা আগত প্রায়। হায়? তাঁর  সেই  বিশাল  'যোগসিদ্ধ' দেহের এ কী অবস্থা! উৎকট  হাঁপানী  রোগে  তাঁর  দেহ  কঙ্কালসার। হাঁফের  টানে  এক একবার  মনে  হতে  লাগল  তাঁর  চোখ  দুটো  যেন  ঠিকরে  বেরিয়ে আসবে! দমকে  দমকে  কাশি, কাশির  টান  কমলেই  ক্ষীণকণ্ঠে বলে চলেছেন  'হাঃ  প্রাণায়াম!  প্রাণ  গয়া  রাম!' কোথায়  গেল  সেই 'জয় বজরংবলী'  হুঙ্কার আর  অট্টনাদ। একী  শোচনীয়  দশা! ইঙ্গিতে  কাছে ডেকে  আমাকে বললেন --- 'সচ  কহু, ইস  প্রাণায়াম বেগারমেঁ  ঞ্জান কা  প্রাপ্তি  নাহি  হোতি। হাঃ  প্রাণায়াম। প্রাণ  গয়া রাম। হাড়োয়া বাবা  সাধুপুরুষ  সন্দেহ নাই।

কলিকাতায়  ফিরে  আসার  কিছুদিন  পরেই  হাড়োয়া  বাবার মৃত্যুসংবাদ  পাই।



https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191

Tuesday, June 18, 2013


প্রায়  সাধু-সন্ন্যাসী  থেকে  গৃহী  সবাইকে  বলতে  শুনি---- আমি  নিত্য  গুরুর  নির্দিষ্ট  পন্থায়  সাধন-ভজন  করি, নিত্য  ধ্যান  করি, দৈবী  অনুভূতির  আশায়  বিভিন্ন  ধর্মস্থানে  ঘুরে  বেড়াই, গুরুকে  ভালবাসি, ইষ্টকে  ভালবাসি। কিন্তু  কাজের  কাজ  কিছুই  হচ্ছে  না। কারণ  "ভালবাসি" অর্থাৎ অহং  এই  কথাটা  দগ্‌দগে  ঘায়ের  মত  মনের  মণিকোঠায়  থেকে  যায়। কারণ "ভালবাসি"র  মধ্যে  আমি  থাকে, থাকে  মায়া, থাকে  লোভ। তাই "ভালবাসি"র  ফুল  বাসি  হয়ে  যায়। ফুল  তুললে, মালা  গাঁথলে, গলায়  পরলে, ঠাকুর  সাজালে  তারপর  প্রয়োজন  ফুরালেই 'বাসি'  ফুল  ফেলে  দিতে  হয়। ভালবাসা  রূপ 'বাসি' ফুলে কি  মৌমাছি  বসবে!  না  গুণ্‌গুণ্‌  করবে!  মধু  জমবে  কোথা  থেকে? তাই  ভালবাসার  জন্য  ভাললাগা  ভাল। তাতে  কি  হচ্ছে  আর  হচ্ছে  না, তার  হিসাব  থাকে  না। যে  বাসায়  ভালবাসা  থাকে  সেখানেই  ত  বাস  প্রেমের  ঠাকুর  মদনমোহনের। ভালবাসাই  ভগবান।

আমি-হীন, মায়া-হীন, লোভ-হীন  প্রকৃত  ভালবাসা  যাঁর  হয়  মহাকালের  সেই  মন্দিরা  তখনই  বাজে---- সুখে  বাজে, দুঃখে  বাজে, ফুলে  বাজে, কাঁটায়  বাজে! আলো-ছায়ায়, জোয়ার ভাঁটায়, ভালয়  মন্দয়,  আশা ও শঙ্কার  মধ্যে  বেজে  চলেছে, তাঁর  নিত্যকালের  ডমরু! তিনি  দয়ার  সাগর। তিনি  মন্দিরে  থাকুন  বা  না  থাকুন  তাঁর  সর্বব্যপ্ত  বিরাট  স্বরূপের  অনুধ্যানই  আসল।


অহংতা  চুরি, অহং  চামারি, অহং  নীচেন  কি  নীচ।
অহং  না  হোতি  বিচমে  তো  সাক্ষাৎ  থে  ঈশ।।

অর্থাৎ  অহংকার  চৌর্যাপরাধের  মত  জঘন্য  অপরাধ। অহংকার-বৃত্তি  মেথরাণী  বা  চণ্ডালিনীর  মত  নীচ। জীব ও  ব্রহ্মের  মধ্যে  দুর্লঙঘ্য  বাধা  স্বরূপ  এই  অহং। এই  অহং  না  থাকলে  জীব  সহজেই অনুভব  করতে  পারত  যে  সে  স্বয়ং  ব্রহ্ম  স্বরূপ। 
তখনই  তাঁর  ইষ্ট  বস্তু  লাভ  সহজ  হয়।


https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191


Monday, June 3, 2013

ভক্তবেশে  আমায়  যারা
                ব্যথাই  হানে  নিতি
আজকে  পাঠাই  তাদের  তরে
                    মোর  হৃদয়ের  প্রীতি।
বন্ধু  নহে  শত্রু  যারা
                      চক্ষে  বহায়  অশ্রুধারা,
পলায়  দূরে  অন্তরেতে
                   ভীষণ  সায়ক  হানি'
আজকে  ভালবাসব  তাদের
               বক্ষে  লব  টানি'।

করল  যে  জন  কৃতঘ্নতা
             'মারীচ'  সম  আসি'
ছল  করে  যে  জানায়  মুখে ---
            'বড়ই  ভালবাসি',
চতুর  সাজি  আমায়  যারা
                           চায়  ভুলাতে  কথার  দ্বারা,
পাঠাই  শুভ  কামনা  মোর
                 পুঁথির  বেশে  সাজি,
পিতরৌ- এর  মন্ত্রবাণী
                           জাগাক্‌  তাদের  আজি।।

Monday, May 27, 2013

তিনি দেখছেন :---


তিনি  দেখছেন !  সতত  পরত  দেখছেন  আমাদেরকে। তাঁর  নির্ণিমেষ  দৃষ্টিতে  আমাদের  প্রতিটি  কর্ম, ভাব  ভাবনা  এষণা  সবই  ফুটে  রয়েছে।  তিনি  বিশ্বতোচক্ষুঃ, তাঁর  বিশ্বব্যাপী  সেই  পরাবর  দৃষ্টির  বাইরে  যাবার  বা  কোন  কিছু  করার  সাধ্য  জীবের  নাই।  তিনি  সবই  সবসময়  দেখছেন। তিনি  দেখছেন   আমরা  কর্মফল  ভোগ  করছি, তাঁরই  অঙ্গীভূত  ও  অংশগত  হয়ে  আমরা  ঘোর  কর্মে  আবদ্ধ  হচ্ছি; তিনি  কেবল  লক্ষ্য  করছেন।  আমরা  জীবরা  বুঝতে  পারছি  না----  নিজেদের  অঞ্জাতসারে----  মোহ  মরীচিকায়  বিভ্রান্ত  হয়ে, অপকর্মের  পর  অপকর্ম  করে  চলেছি। ভ্রমেও  একবার  মনে  করছি  না  যে, একজন  উপর  হতে  আমাদের  দিকে  অপলক  দৃষ্টিতে  তাকিয়ে  রয়েছেন।

কিন্তু  বারেকের  জন্যও  হ্যয়, তাঁর  প্রতি  যদি  আমাদের  দৃষ্টি  পড়ত!  যদি  জীবের  একবারও  দৃষ্টি  পড়ত!  তাঁর  দিকে, যদি  একটিবার  বুঝতে  পারত, অনুভব  করতে  পারত  যে  আর  একজনের  দৃষ্টি  তার  উপর  ন্যস্ত  আছে,  তাহলে  কি  কোন  অপকর্মে  কেউ  প্রবৃত্ত  হতে  পারত? নিজের  ঘরে  স্বামী  স্ত্রী  উভয়ে  মিলিত  হতে  গিয়ে  যদি  দেখে  পাশের  বাড়ী  হতে  জানালা  দিয়ে  কোন  বয়স্ক  পুরুষ  মহিলা  এমনকি  একটি  ফুটফুটে  কচি  শিশুও  তাদের  দিকে  তাকিয়ে  আছে, তাহলে  লজ্জা  ও  সঙ্কোচ  বসে  নিজের  ঘরের  জানালাটা  বন্ধ  করে  দিয়ে, আলো  জ্বললে  অন্ততঃ  আলোটা  নিভিয়ে  দেয়। সেইরকম  জীবের  যদি  বোধ  জাগে  যে, সব  কাজেরই  সাক্ষী  রয়েছেন  একজন তাহলে  কারও  পক্ষে  কোন  অসৎ  ভাবনা  বা  অসৎ  কাজ  করা  কোন  মতেই  সম্ভব  হত  না। 

দ্রষ্টার  প্রতি  দৃষ্টি  পড়লে  তিনি  আছেন, সর্বত্র  আছেন। তাঁর জ্যোতিষ্মান  দৃষ্টি  অহরহ  জাগ্রত  আছে। এই বোধ  দৃঢ়  হলেই কর্মেরর বিপাক  কেটে  যায়। সেই  দৃষ্টিই  দ্রষ্টার  নিকটে  দোর্ষিতকে  নিয়ে যায়। সেই  দৃষ্টির  প্রভাবেই  জীব  মুক্তি  লাভ  করে। ব্যষ্টি  মিলে যায় সমষ্টিতে। জীব চৈতন্যের নির্যান ঘটে অনন্ত চৈতন্যে।

Monday, May 13, 2013

*** মাতৃস্নেহের মাত্রা কেহ জানেনা ধীমান্‌ !


Cont ......(last)

চোখ  বন্ধ  হওয়ার  সঙ্গে  সঙ্গে  আমার  চোখে  এক  অপরূপ  দৃশ্য  ফুটে  উঠল। ফুটে  উঠল  এই  মন্দির। আমরা  হর  নর্মদে  বলতে  বলতে  অর্জুনেশ্বর  মন্দিরে  এসে  পৌঁচেছি, দড়াম  করে  মন্দিরের  দরজা  খুলে গেল। সেই  শুক্লবসনা  শুভ্রকেশী  বৃদ্ধা  গলায়  রুদ্রাক্ষ মালা, দুধের  কলসী  হাতে  নিয়ে  বেরিয়ে  এলেন। অপলক  দৃষ্টিতে  তাঁর  দিকে  তাকিয়ে  আছি।


ধীরে  ধীরে  তাঁর  দেহাভ্যন্তর  থেকে  প্রকটিত  হল  আর  এক  দিব্যাঙ্গনা, জ্যোতির্মণ্ডিতা  মায়ী। সেই  মায়ের  ডান  হাতে  ত্রিশূল বাম  হাতের  চেটোয়  এক  অপূর্ব  সুন্দর  জ্যোতির্লিঙ্গ, লিঙ্গ  হতে  জ্যোতির  কণা  ঠিকরে  পড়ছে। এখন  আর  সেই  দুগ্ধদানরতা  মাতৃমূর্তি  চোখে  ভাসছে  না। সামনে  ভাসছে  তাঁর  নতূন  পরিবর্তিত  দিব্যরূপ; যাঁর  দেহের  প্রতিটি  রোমকূপ  হতে  যেন  স্বর্গীয়  সুষমা  ঝরে  পড়ছে। তাঁকে  ঘিরে  তাঁর  সামনে  পিছনে  জটাজুট  বহু  মহাত্মা  নতজানু  হয়ে  কৃতাঞ্জলি  পুটে  গাইছেন ------



ওঁ  সুখদাং  সমুদাং  সুরনরবন্দিতাং  সর্বকামদাং  শর্মদাং।
বন্দে  নর্মদাং। বন্দে  নর্মদাং।
ওঁ  উজ্জ্বলাঙ্গীং  নতজনতারিণীম্‌  তূর্ণগামিনীং  জনবনচারিণীং।
তরঙ্গিণীং  তততটশোভিনীম্‌  শুভদাং  বরদাং কর্মদাম্‌।
বন্দে  নর্মদাম্‌।। বন্দে  নর্মদাম্‌।।

বিহ্বল  ও  বিভোর  হয়ে  এই  দৃশ্য  দেখতে  লাগলাম। মনে  আর  আনন্দ  ধরে  না। তারপর  ধীরে  ধীরে  সেই  দৃশ্য  অন্তর্হিত  হয়ে  গেল। আমি  জ়েগে  উঠলাম। ঘর  অন্ধকার, চোখ  খুলে  কিছু  দেখতে  পাচ্ছি  না, পাখীর  কলরব  শুনে  বুঝতে  পারছি  সকাল  হয়ে  গেছে। 

উঠে  বসলাম।  হাতের  কাছে  টর্চটা  টিপে  দেখলাম, একমাত্র  বাসবানন্দজী  এবং  তুরীয়  চৈতন্য  নামক  ব্রহ্মচারী  ছাড়া  আর  সকলেই  উঠে  বসেছেন। হরানন্দজী, প্রেমানন্দ  প্রভৃতি  দণ্ডী  সন্ন্যাসীরা  নীরবে  কাঁদছেন। আমি  উঠে  বসে  দেখি  হিরন্ময়ানন্দজী  অশ্রুসজল  কণ্ঠে  বলে  উঠলেন --- হম্‌  সচ্‌  হু, দুপহরমেঁ  যো  মায়ী  হম্‌  লোগোঁকো  দুধ  দিয়া  থা,  উনোনে  স্বয়মেব  নর্মদা।

হরানন্দজী  কাঁদতে  কাঁদতেই  বললেন ---  সে  বিষয়ে  আমার  কোনই  সন্দেহ  নাই। তবে  দুঃখ  এই  স্বপ্নে  মা  তাঁর  পরিচয়  দিয়ে  গেলেন, জাগ্রতাবস্থায়  মাকে  চিনতে  পারলাম  না। তখনই  আমার  হাতদুটো  নিস্‌  পিস্‌  করছিল  পা  দুটো  জড়িয়ে  ধরতে। কিন্তু  দণ্ডী  সন্ন্যাসীর  ফালতু  মর্যাদাবোধ  আমাকে  সে  কাজ  করতে  বিরত  করেছে।

প্রেমানন্দ  এবং  আরও  দুজন  সন্ন্যাসী  একসঙ্গে  বলে  উঠলেন ---  আমরা  স্পষ্টাস্পষ্টি  বলছি, স্বপ্নে  দেখলাম, সেই  বৃদ্ধমায়ীর  শরীর  ধীরে  ধীরে  রূপান্তরিত  হয়ে  মা  নর্মদার  যে  ধ্যানমূর্তির  বর্ণনা  মহর্ষি  মার্কণ্ডেয়  জগদ্‌গুরু  শঙ্করাচার্য  এবং  মহর্ষি  কপিল  প্রভৃতি  দিয়ে  গেছেন, সেইরকম  শ্বেতাম্বরা  শিবকন্যার  দিব্যরূপ  ফুটে  উঠেছিল।

হরানন্দজী  আবার  বললেন ---  নাঙ্গা  সাধু  ঠিকই  মায়ের  প্রকৃত  স্বরূপ  বুঝতে  পেরেছিল, তাই  তাঁর  দেহে  মনে  অস্বাভাবিক  স্ফুর্তি  প্রকাশ  ঘটেছিল। বেটা, বিন্দুমাত্র  আভাষ  দিলেন  না, একা  একা  সমাধির  আনন্দ  ভোগ  করলেন। অশ্রুরুদ্ধ  কণ্ঠে  রঞ্জন  গেয়ে উঠল 


" যে  তোমায়  ছাড়ে  ছাড়ুক,  আমি  তোমায়  ছাড়বো  না  মা!
            আমি  তোমায়  ছাড়বো  না।
মাগো!  আমি  তোমার  চরণ  করব  শরণ
               আর  কারও  ধার  ধারব  না।
কে  বলে  তোর  দরিদ্র  ঘর,  হৃদয়ে  তোর  রতনরাশি ----
আমি  জানি  গো  তার  মূল্য  জানি।
পরের  আদর  কাড়ব  না  মা, পরের  আদর  কাড়ব  না।
মানের  আশে  দেশবিদেশে,  যে  মরে  সে  মরুক  ঘুরে ---
তোমার  ছেঁড়া  কাঁথা  আছে  পাতা ---
ভুলতে  সে  যে  পারব  না,  ভুলতে  সে  যে  পারব  না।
ধনে  মানে  লোকের  টানে, ভুলিয়ে  নিতে  চায়  যে  আমায় ---
ওমা,  ভয়  সে  জাগে  শিয়র ---  বাগে ---
কারও  কাছেই  হারব  না  মা,  কারও  কাছেই  হারব  না।
যে  তোমায়  ছাড়ে  ছাড়ুক,  আমি  তোমায়  ছাড়বো  না  মা!
                  আমি  তোমায়  ছাড়বো  না। "






*** মাতৃস্নেহের মাত্রা কেহ জানেনা ধীমান্‌ !


...... আমার  কথা  শেষ  হতে  না  হতেই  দড়াম  করে  এক  প্রচণ্ড শব্দে  অর্জুনেশ্বরের  মন্দিরের  দরজা  খুলে  গেল। আমরা  সকলেই  চমকে  উঠলাম। প্রথমে  ভেবেছিলাম  হয়ত  নর্মদার  দিক  হতে  উত্তরের  ঝাপ্‌টা  বাতাসের  ধাক্কায়  দরজাটা  খুলে  গেল। কিন্তু  পরে  দেখলাম  না! দমকা  বাতাসের  ঝাপটা  নয়, মন্দিরের  অভ্যন্তর  হতে  একটা  কালো  রং-এর  কলস  হাতে  নিয়ে  এক  শুভ্রবসনা  শুক্লকেশা  এক  বৃদ্ধমায়ী  বেরিয়ে  এসে  আমাদের  সামনে  বসলেন। কলসীভরা  দুধ  এবং  একটি  গ্লাস  রাখলেন  আমাদের  সামনে।

বললেন ---  হম  অগল  বগল  মেঁ  হি  নিবাস  করতা  হুঁ। ইধর ভগবান  কা পাশ  মে  বৈঠকর  জপ  করতা  থা। কোঈ  জানোয়ার  আ কর  তন্‌  না  করে, ইসীওয়াস্তে  হম্‌  কিবাড়  বন্ধ  কিয়া  থা। দণ্ডী  সন্ন্যাসীয়োঁকে  দুধ  পিলানেকে  লিয়ে  হমারা  বহুৎ  দিনোঁ  সে  সংকল্প  থা, আজ  ভগবান  অর্জুনেশ্বরকী  কৃপা সে  মুঝে  মোকা  মিলা। লেও  দুধ  পিজিয়ে। এই  বলে  তিনি  কলসীতে  তামার  গ্লাস  ডুবিয়ে  ডুবিয়ে  আমাদেরকে  দুধ  দিতে  থাকলেন  প্রত্যেকের  কমণ্ডলুতে। আমরা  দুধ  পান  করতে  লাগলাম।


সবার  শেষে  নাগাজীকে  তামার  গ্লাস  ভর্তি  দুধ  দিয়ে  বললেন --আপকা  পাশ  ত  তনিকভর  কুছ  নেহি, না  লোটা,  না  কমণ্ডলু। আপ্‌  ইসীমেঁ  দুধ  পিকর  ইয়ে  পাত্র  নর্মদা  মেঁ  ফেক  দেনা। হামারা  পাশ  দুসরা  পাত্র  হ্যায়।


মাতাজী  যখন  দুধের  পাত্রটি  নাগা  বাবাকে  এগিয়ে  দিলেন, তখনই  নাগাজীর  উপর  দৃষ্টি  পড়ল। দেখলাম, তিনি  থরথর  করে  কাঁপছেন। যাঁকে  এতদিনের  মধ্যে  একবারও  খেতে  দেখিনি, না  দুধ  না  ফল,  এমন  কি  জলও  নয়, আজ  দেখলাম, তিনি  সাগ্রহে  মায়ীর  হাত  থেকে  দুধের  গ্লাস  নিয়ে  এক  চুমুকেই  শেষ  করে  ফেললেন।


মায়ী  দুধের  কলস  হাতে  নিয়ে  ধীরে  ধীরে  চলে  গেলেন, নিকটস্থ  ভীমেশ্বর  মন্দিরের  দিকে। যেতে  যেতে  পিছন  ফিরে  বলে গেলেন ------ আজ  আপ  লোগোনেঁ  ইধার  ঠার  সকতে  হৈ। জন্তু  জানোয়ার  বগেরাঁ  কো  কোঈ  ডর  নেহি। নাগাজীর  কাঁপুনি  আর  থামে  না। তিনি  কাঁপতে  কাঁপতেই  শুয়ে  পড়লেন, মন্দিরের  দাওয়ায়।


ভীমেশ্বর, ধর্মরাজ  প্রতিষ্ঠিত  ধর্মেশ্বর  মন্দির, লুকেশ্বর  তীর্থ, জটেশ্বর  তীর্থ  পরপর  দেখতে  দেখতে  সাড়ে  ৪ টে  বাজে। ঠাণ্ডা  বাতাস  বইছে।  আমরা  দ্রুত  ফিরে  চললাম  নর্মদার  তট  ধরে  অর্জুনেশ্বর  মহাদেবের  মন্দিরে  উদ্দেশ্যে।  সেখানে  পৌঁছে  দেখি,  নাঙ্গা  মহাত্মা  উঠে  বসেছেন। তাঁর  সর্বাঙ্গে  অস্বাভাবিক  ভাবে উজ্জ্বল  দেখাচ্ছে। হরানন্দজী  তাঁকে  দেখেই  বললেন --- কী  ব্যাপার! আজ  যে  দেখছি, সর্বাঙ্গে  স্ফুরিছে  জ্যোতি, আঁখিপাতে  প্রশান্তির  ছায়া!


তিনি  সলজ্জভাবে  উত্তর  দিলেন --- 'আজ  খুব  ঘুমিয়ে পড়েছিলাম'।


----- ঘুম  না  সমাধি! দেখুন  মশাই  আমাদের  গুরুদেবের  সবিকল্প  আনন্দ  সমাধি  দর্শনের  বহুবার  সুযোগ  হয়েছে। কামরূপ  মঠের  সন্ন্যাসীকেও  জিনিষ  লুকাতে  পারবেন  না। যাক্‌গে, আপনার  মত  সাথী  পেয়ে  আমরা  খুশী।'


নাগাজী  হরানন্দজীকে  আর  কথা  বলার  সুযোগ  না  দিয়ে  তাড়াতাড়ি  উঠে  পড়লেন।  বললেন --- আমি  অদূরে  ধর্মেশ্বর  মন্দিরে  আজ  রাত  কাটাবো। আপনারা  সকলেই  এই  মন্দিরে  প্রবেশ  করুন। ভোরেই  আমি  আপনাদের  কাছে  পৌঁছে  যাবো। এই  বলে  তিনি চলে  গেলেন  ধর্মেশ্বর  মন্দিরের  দিকে। 


আমরা  টর্চ  টিপে  ঢুকে  পড়লাম  মন্দিরে। মন্দিরের  দরজা  বন্ধ  করে  আমরা  যে  যার  আসন শয্য  পেতে  নিলাম। মহাদেব  অর্জুনেশ্বরকে  প্রণাম  করে  আমরা  বসে  গেলাম  সান্ধ্যক্রিয়ায়। ঘণ্টা  দুই  ধরে  সকলেই  জপ  ধ্যান  করে  সকলেই  শুয়ে  পড়লাম, কম্বল  মুড়ি  দিয়ে।


আমার  একপাশে  হরানন্দজী  এবং  অন্যপাশে  রঞ্জন  শুয়েছেন। হরানন্দজী  আমাকে  ফিস্‌ফিস্‌  করে  জানালেন --- আশ্চর্য  বাইরে  যথেষ্ট  কনকনে  ঠাণ্ডা  বাতাস  ঝড়ের  মত  বইলেও  এই  মন্দিরের  মধ্যে  তেমন  ঠাণ্ডা  লাগছে  না। আমি  মতলব  করে  রেখেছিলাম, তিন দিন  আগে  আপনার  দেওয়া  এক  রেণু শঙ্খিনী  খেয়েছিলাম, আজও  ঐ  নাগা  বাবার  দেওয়া  এক মাত্রা  খাবো।কিন্তু  মন্দিরের  মধ্যে  তত  শীত  অনুভব  না  হওয়ায়  আর খেতে  ইচ্ছা  করছে না।


কী ব্যাপার  বলুন  তো, যিনি  আমাদেরকে  দুধ  খাইয়ে  গেলেন, তাঁর  কথামত  আমরা  আজ  মন্দিরে  থেকেছি  বলে  কি, ঐ  শুদ্ধসত্ত্ব  মায়ীর  বাক্য বলেই  শীত  আজ  কম  বলে  অনুভূত  হচ্ছে? আমি  ফিস্‌ফিস্‌  করেই  বললাম --- হতে  পারে! ঐ  মায়ী  যদি  তপস্বিনী  হন, তাহলে তাঁর  বাক্যবলে  সবই  সম্ভব। আমার  খুব  ঘুম  পাচ্ছে, পরে  কথা  হবে। এই  বলে  ঘুমিয়ে  পড়লাম।



To  be continued ............