Wednesday, February 15, 2012

খাড়েশ্বরী মহারাজঃ---


Cont (Last) .............. 

গুলজারী ঘাটের মন্দির দর্শনের পর বিন্ধ্যেশ্বরীজী বললেন---- 
গুরুজীকো ছোড়কে জ্যায়দা সময় বাহার মেঁ রহ্‌না ঠিক নেহি। গুলজারী ঘাটের শিবমন্দিরের দরজা খুলেছে। প্রণাম করে গুলজা গ্রামে ঠাড়েশ্বরী মহারাজের আশ্রমে ফিরে এলাম। 

তখনও অনেক বেলা আছে। এসে দেখলাম ঠাড়েশ্বরীজী সেই একইভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। বিন্ধ্যেশ্বরীজী তাঁর গুরুদবকে প্রণাম করে কুটিরে গিয়ে ঢুকলেন, আমি নর্মদার ঘাটে গিয়ে বসলাম। মনের মধ্যে অনেক চিন্তা ভিড় করে এল। হিন্দুধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধুদেরকে ইষ্টসিদ্ধির জন্য অনেক রকম শারীরিক নির্যাতন ভোগ করতে দেখেছি। প্রয়াগে কুম্ভমেলায়, কল্পবাস ব্রত পালনের সময় মাঘমেলায় আমি ঊর্ধবাহু, আকাশমুখী, পঞ্চধুনী, জলশয্যী প্রভৃতি নানা শ্রেণীর সাধু দেখেছি। গুদড়ী সম্প্রদায়ের সাধু সবসময় চলতে থাকেন, হয় পথে নতুবা একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে পদচালনা করতে করতে তাঁদের দুটো পা ফুলে গেছে তবুও হাঁটার ছন্দে তাঁদের পদচালনায় বিরাম নাই।

কেউ কেউ এক বা উভয় বাহুকে সতত উর্ধেই তুলে রাখেন। কেউ বা উপরের দিকে কোন গাছের ডালে পা দুটো বেঁধে রেখে অধোমস্তকে ঝুলতে থাকেন এবং মাথার নিচে অগ্নিকুণ্ড স্থাপন করেন। এঁদের নাম ঊর্ধমুখ তপস্বী।মেদিনীপুর জেলার ধলহারা গ্রামে 'পাগলী মা' বা গৌরীমা নামে একজন মহাসাধিকা ছিলেন। আমার জীবনে তিনিই প্রথম সাধু। তখন আমার বয়স মাত্র বার।আমাদের গ্রামবাসী পুঁটিরাম পাত্র নামে পাগলীমায়ের এক শিষ্যের সঙ্গে তাঁকে দর্শন করার জন্য বাবা আমাকে পাঠিয়েছিলেন।

গিয়ে দেখেছিলাম, বৈশাখ মাসের খর রৌদ্রে পাঁচ পাশে পাঁচটা অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেই যোগেশ্বরী মা পঞ্চতপা করছিলেন। তাঁর গুরু ভূষণানন্দজী ছিলেন ত্রাটক সিদ্ধ মহাযোগী।তিনি প্রতিদিনই সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সূর্যের দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন।কুম্ভমেলাতে কাউকে দেখেছি কাঁটার উপর শুয়ে আছেন, কেউ বা প্রচণ্ড শীতে গলা পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে সাধনা করে চলেছেন। এঁদের নাম জলশয্যী।অযোধ্যার সরযূতীরে এক মহাত্মার জল-তপস্যা দেখেছিলাম, একটি মাচার নিচে একটি খাদ, খাদটি জলপূর্ণ, তার মধ্যে তিনি গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে আছেন, মাচার উপর একটি ছিদ্রযুক্ত কলস, দুজন সেবক অহরহ সেই কলসে জল ঢালছেন,সেই জল সাধুর মাথার উপর গিয়ে পড়ছে। তিনি তন্ময় হয়ে ইষ্টনাম জপ করে চলেছেন।

পঞ্চধূনী বা পঞ্চতপার চেয়েও এই জল-তপস্যাকে কঠিনতর বলে মনে হয়েছিল।এখানে এই গুলজা গ্রামের ঠাড়েশ্বরী মহারাজকে দেখছি দিবারাত্র দণ্ডায়মান অবস্থায় নিজের সাধনায় মগ্ন আছেন। 
এইসব কথা ভাবতে ভাবতে নিজের মনে ধিক্কার জন্মাল।আমার পক্ষে ত কোন উগ্র তপস্যাই সম্ভব নয়। তাহলে আমার কি হবে? নর্মদেশ্বর শিবের উদ্দেশ্যে বললাম- প্রভু! তোমার কৃপালাভ করতে হলে এত যদি উৎকট উগ্র তপস্যার প্রয়োজন হয়, তাহলে তোমার নাম আশুতোষ কেন?

সূর্যাস্ত হচ্ছে, ধীরে ধীরে অন্ধকারের ঢল নামছে বিন্ধ্যপর্বতের সর্বত্র। আশ্রমে ফিরে এলাম, পাঁচ-ছয়জন মহিলা এসে আমলকীর ডালে প্রদীপ জ্বালিয়ে ঝুলিয়ে দিচ্ছেন।

বিন্ধ্যেশ্বরীজী ধূপ, দীপ এবং কর্পূর জ্বালিয়ে তাঁর গুরু ঠারেশ্বরী মহারাজের আরতি করতে করতে বলছেন----


আনন্দমানন্দকরং প্রসন্নং ঞ্জানস্বরূপং নিজবোধযুক্তম্‌।
যোগীন্দ্রমীড্যং ভবরোগবৈদ্যং শ্রীমদ্‌গুরুং নিত্যমহং ভজামি।।

ঠাড়েশ্বরীজীর দেহে মনে কোন চাঞ্চল্য নাই, বিকার নাই, কোন দিকে দৃকপাত করছেন না, তাঁর অপলক দৃষ্টি একইভাবে নর্মদার দিকে নিবদ্ধ রয়েছে।

আরতি শেষ হতেই মায়েরা চলে গেলেন। বিন্ধ্যেশ্বরীজী ঠাড়েশ্বরীজীকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন। আমিও প্রণাম করলাম। প্রণাম করে উঠে দাঁড়াতেই দেখলাম, তাঁর ডানহাতের তর্জনীটি আহ্বানের ভঙ্গীতে নড়ে উঠল,দৃষ্টি সেই একইভাবে নর্মদার দিকে, আমি তাঁর তর্জনীর ইঙ্গিত বুঝতে পারিনি, বিন্ধ্যেশ্বরীজী আমার গায়ে টোকা দিয়ে মহাত্মার কাছে এগিয়ে যেতে সংকেত করলেন। আমি তাঁর কুণ্ডলের কাছে এগিয়ে যেতেই তিনি মৃদুকণ্ঠে বলে উঠলেন---য়হু খালা কা ঘর নাঁহি। 

এই খণ্ডিত বাকাংশের মর্ম কিছু বুঝলাম না। বক্তার দৃষ্টিতে যদি কোন vibration or expression না থাকে তাহলে এমনিতেই বক্তব্য বিষয়ের রস বা ভাব উপলব্ধি করা যে কোন শ্রোতার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষতঃ এখানে তাঁর উচ্চারিত শব্দগুলি আংশিকভাবে উচ্চারিত হয়েছে, যার আক্ষরিক শব্দার্থ হল---এটা মাসীর বাড়ী নয়! হঠাৎ কোন কথা নাই বার্তা নাই, বিনা প্রসঙ্গে আচমকা তিনি এমন কথা কেন বললেন বুঝতে পারলাম না। আমি নীরবে দাঁড়িয়েই রইলাম।

এক মিনিট পরেই তিনি আবার মৃদুকণ্ঠে বলতে লাগলেন--- 


কবীর য়হু ঘর প্রেম কা,খালা কা ঘর নাঁহি।
সীস উতারৈ হাথি করি, সে পৈসে ঘর মাহিঁ।।
কবীর নিজ ঘর প্রেম কা মারগ অগম অগাধ।
সীস উতারি পগ তলি ধরৈ তব নিকটি প্রেম কা স্বাদ।।

অর্থাৎ নিজের হাতে মাথা কেটে হাতে নিয়ে প্রবেশ করতে হবে প্রভুর প্রেম-মন্দিরে।দুর্গম সেই পথ, অসীম তার বিস্তার।এ মাসীর বাড়ী নয় যে আবদার করলে আর চোখের জল ফেললেই যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যাবে!

মহাত্মা আর কিছু বললেন না---আগের মতই নীরব নিথর নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমরা কুটিরে ফিরে এলাম।বিন্ধ্যেশ্বরীজী আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলেন।কারণ, তাঁর গুরুদেব ক্কচিৎ কদাচিৎ কারও কারও সঙ্গে দু'একটি কথা বলেন বটে কিন্তু গত বিশ বৎসরের মধ্যে আমাকে নিয়ে মোট তিনজনের সঙ্গে কথা বলতে তিনি দেখলেন।কাজেই আমার মহাসৌভাগ্য। 

বিছানায় বসে নানা কথা ভাবতে লাগলাম।বিকেলে নর্মদার ঘাটে বসে পঞ্চতপা, জলতপা, উর্ধ্বপদ, হেঁটমুণ্ডে থাকা এবং দিন রাত্রি দাঁড়িয়ে থাকা প্রভৃতি তপস্যাকে আমি উৎকট এবং উগ্র ভেবে মনে মনে ভগবানের কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছিলাম যে এত কঠোর তপস্যা ছাড়া তোমাকে পাওয়া যাবে না, এই যদি তোমার বিধান হয় তাহলে তোমার আশুতোষ নাম কি মিথ্যা? বুঝতে পারলাম---ঠাড়েশ্বরী মহারাজ আজ সন্ধ্যায় তারই জবাব দিয়েছেন।বিন্ধ্যেশ্বরীজী আমাকে আগেই কথায় কথায় জানিয়েছেন যে আমি যেদিন সন্ধ্যায় এখানে এসে পৌঁছলাম সেদিনই মধ্যাহ্নে নাকি তাঁর গুরুদেব আমার আসার কথা পূর্বাহ্নেই জানিয়ে দিয়েছিলেন।মহাত্মা কি সত্যই অন্তর্যামী? 

হোন তিনি অন্তর্যামী, তবুও তাঁর ঐরমক তপস্যার উগ্রতাকে ভগবৎ প্রাপ্তির উপায় বলে সর্বান্তকরণে গ্রহণ করতে পারছিলাম না। আমার মনে হল, আপাতঃদৃষ্টিতে ঠারেশ্বরী মহারাজের ঐরকম বিচিত্র তপশ্চরণকে যতই কঠোর মনে হোক, এর মূলেও আছে ভগবানের প্রতি বিশুদ্ধ প্রেম।

প্রীতম প্রিয়তমের প্রতি আকুল-করা পাগল-করা সেই সব ভুলানো প্রেম ভাব না জন্মালে কি কোন মানুষের পক্ষে নরদেহ ধারণ করে এত কষ্ট সহ্য করা সম্ভব হয়? কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ভক্তিস্নিগ্ধ ভাষায় এই রকম অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, যার হৃদয়ে ভগবৎ প্রেমের আলো এসে পড়েছে---'তার বক্ষে বেদনা অপার, তার নিত্যজাগরণ'। 

যে ভগবানের প্রেমে বিভোর হয়, সেই ত জীবনে এবং আচরণে দেখাতে পারে, বলতে পারে---ওরে মন, ওরে আমার প্রিয়বন্ধু, বিবেচনা করে দেখ, প্রণয়ী হলে কি তার শোয়া চলে? সমুঝ দেখ মন মিত পিয়ারা আসিক হো কর্‌ শোনা ক্যা রে? 

ঠারেশ্বরী মহারাজের আমার শুকানো যোগীমাত্র বলে মনে হচ্ছে না, তিনিও আসিক।প্রেমিক বলেই তাঁর শোয়া বসা নাই। অপলক দৃষ্টিতে অহোরাত্র তাঁর প্রেমাস্পদের দিকেই তাকিয়ে আছেন। 

কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। যখন ঘুম ভাঙলো, তখন ভোর হয়ে আসছে। কম্বল মুড়ি দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ফাল্গুন মাস পড়ে গেলেও তখনও খুব শীত। কুশায়ার অন্ধকারে সব ঢেকে আছে।কৌতুহল বশে পা টিপে টিপে মহাত্মা যেখানে দাঁড়িয়ে সেখানে এলাম। তাঁর জটা এবং পরিধেয় গৈরিক বস্ত্রখণ্ড শিশির পড়ে ভিজে গেছে। তাঁর ডান দিকের এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, যাতে তিনি আমাকে দেখতে না পান। সহসা দক্ষিণ হস্তের তর্জনী কিঞ্চিৎ নড়ে উঠল। সন্ধ্যাবেলার মত এটাকে তর্জনী সংকেত মনে করে সাহসে ভর করে সামনে এসে দাঁড়ালাম। প্রায় দু'মিনিট পরে পূর্বের মতই মৃদুকণ্ঠে বলে উঠলেন---- 


প্রীতম্‌ হসনাঁ দূরি করি, করি রোবন সৌঁ চিত্ত।
বিন্‌ রোয়াঁ বস্তুঁ পাই এ প্রেম পিয়ারা মিত্ত।।
হঁসি হঁসি কান্ত ন পাইএ,জিন্‌ পায়া তিন্‌ রোই।
জো হাঁসে হী হরিমিলৈ তব্‌ নহীঁ দুহাগিন্‌ কোঈ।।

অর্থাৎ প্রিয়তম এমনিতর দুঃখের পথ দিয়েই আসেন। হাসতে হাসতে তাঁকে পাওয়া যায় না। যে তাঁকে পেয়েছে কাঁদতে কাঁদতেই পেয়েছে; দিন রাত তার চোখের জল ঝরছে, তবে প্রিয়তমের সঙ্গে তার মিলন ঘটেছে। হাসতে হাসতে যে হরিকে পেল তার মত দুর্ভাগা আর কেউ নাই।

আবার সব চুপচাপ। আমি ধীরে ধীরে তাঁর কাছ হতে সরে এলাম।

https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191




Thursday, January 19, 2012

খাড়েশ্বরী মহারাজঃ---


......বেলা অনেকখানি বেড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে, কেননা প্রায় পাঁচটা বাজতে চলল, এখনও সূর্য সম্পূর্ণতঃ অন্ত যায় নি। এখনও পথঘাট, পাহাড়, পাহাড়ের গাছপালা সব স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি। অবশেষে গুলজা গ্রামে এসে পৌঁছে গেলাম।

ছোট ছোট ছেলেরা একটা খেলার মাঠে খেলা করছিল ছোট একটা বল নিয়ে।একজন লোক তাদেরকে খেলা ছেড়ে ঘরে ফিরতে তাড়া দিচ্ছে---'অব বস্‌ করো জী। খেল্‌ ছোড়কে ঘর মে চলো।' খেলা ছেড়ে ঘরে ফেরাই ত আসল কথা, লাখ কথার এক কথা। একবার একটি ধোপা মেয়ে তার বাবাকে বলছিল---'বেলা গেল, বাস্‌নায় আগুন দাও'--- সেই কথা শুনেই লালাবাবুর মনে তীব্র বৈরাগ্যের উদয় হল, তিনি সঙ্গে সঙ্গে অগাধ ঐশ্বর্য ত্যাগ করে বৃন্দাবনে গিয়ে ভজনে ডুবে গেলেন। আমি ত আর লালাবাবু নহ, কাজেই ছেলেদের প্রতি লোকটির উক্তি যতই গভীর অর্থবহ হোক না কেন, আমার মনে ভাবান্তর ঘটল না। আমার এখন রাত্রির জন্য আশ্রয় প্রয়োজন, বিশ্রাম প্রয়োজন।

লোকটির কাছে তারই সন্ধান চাইলাম। তিনি বললেন--- আধা ঘণ্টা চলনেসে আপ্‌ গোদারিয়া সংগম গুলজারীঘাটমেঁ পঁহুজ যায়েগা।উধর মন্দির ভি হ্যায়,পরিক্রমাবাসীয়োঁ কে লিয়ে আচ্ছা ইন্তেজান ভি হ্যায়।

---'ইধর কোঈ মন্দির নেহি হ্যায়? হম্‌ বহোৎ থক্‌ গিয়া।'

---হমারা ছোটিসি মহল্লামেঁ মন্দির নেহি হ্যায়, কেঁওকি গুলজারীঘাট বহোৎ নজদিগ্‌ হ্যায়, উধর শিউজীকা আচ্ছা মন্দির হ্যায়, হম্‌লোগ্‌ উধরই পূজা করতা হুঁ। তব্‌ চলিয়ে ঠাড়েশ্বরী মহারাজকা পাশ, উনকা কোঠিমেঁ জাগাহ্‌ মিলেগা।মিনিট তিনেক হেঁটে নর্মদার ধারে ঠাড়েশ্বরী মহারাজের কাছে পৌঁছে গেলাম।

দেখলাম, একটি আমলকী গাছের কাছে এক ছয় ফুট দীর্ঘদেহী সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে আছেন।ছোট ছোট চারাগাছকে গরু ছাগলের গ্রাস হতে রক্ষা করার জন্য কাঠ বা বাঁশের যেমন কুণ্ডল দিয়ে ঘিরে রাখা হয় সেইরকম এক কাঠের কুণ্ডলের মাঝখানে ঠারেশ্বরী মহারাজ দাঁড়িয়ে আছেন।

নগ্ন গাত্র, কোমরে জড়ানো আছে এক টুকরো গৈরিক বস্ত্র।অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন নর্মদার দিকে।মৃদু কণ্ঠে জপ করে চলছেন সেই একই নাম, মহানাম-রেবা, রেবা, রেবা। আমলকী গাছের ডালে আকাশ প্রদীপের মত আট দশটা প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ ঝুলছে।সেই আলোতে দেখলাম-পাশাপাশি দুটি কুটির আছে।

আমার সঙ্গী লোকটি 'গোড় লাগি মহারাজ' বলে সশব্দে যুক্তকরে প্রণাম করতেই সেই শব্দ শুনে কুটির থেকে একজন গেরুয়াধারী বেরিয়ে এলেন। তিনি লোকটির কাছে আমি আশ্রয়প্রার্থী জেনে আমাকে দ্বিতীয় কুটিরটিতে থাকবার ব্যবস্থা করে দিলেন।কথায় কথায় জেনে নিলাম এই সাধুর নাম বিন্ধ্যেশ্বরী, তিনি ঠারেশ্বরী মহারাজের শিষ্য এবং সেবক।

ঠাড়েশ্বরী মহারাজকে কেউ কেউ খাড়েশ্বরী মহারাজ বলেও সম্বোধন করে থাকেন।

এই গুলজা গ্রামে নর্মদাতীরে তিনি এইরকম দাঁড়ানো অবস্থাতেই কুড়ি বছর ধরে তপস্যা করছেন।কেউ কখনও তাঁকে এইরকম দণ্ডায়মান অবস্থা ছাড়া বসা বা শোয়া অবস্থায় দেখে নি, দিবারাত্র সঙ্গে থেকে তিনিও দেখেন নি।ঐ রকম অবস্থাতেই তিনি শৌচাদি এবং ভোজন কর্মাদি সেবকের সাহায্যে করে থাকেন।

বিন্ধ্যেশ্বরীজীর সঙ্গে নিতান্ত প্রয়োজনে দু'একটা কথা ছাড়া আর কারও সঙ্গে কোন কথাবার্তা বলেন না।শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, সর্ব ঋতুতে তিনি নগ্নগাত্রে দাঁড়িয়ে থেকে নিরন্তর রেবা মন্ত্র জপ করে চলেছেন।
বিন্ধ্যেশ্বরীজী অত্যন্ত শ্রদ্ধাপ্লুত কণ্ঠে সাগ্রহে আমাকে জানালেন---মেরে গুরুজীকে পাশ সবকিছু ঋদ্ধি-সিদ্ধি হ্যায়। দেহাত সে বহোৎ আদমী ইধর আতা হৈ মাথা টেকতা হৈ ঔর চলা যাতা হৈ।ব্যাস্‌, ইসীসে উনলোগোঁকা দিল্‌কা বাসনাকি পূর্তি হো জাতা হৈ। অপ্‌ ইধর আজ আয়েঙ্গে, এবাত্‌ পহেলেসে উনোনে বাতা দিয়া হৈ। ইসি ওয়াস্তে এ কামরা ভি আপ্‌কো লিয়ে খালি করকে রাখ্যা হৈ।

এই কথা শুনে আমি খুবই অবাক হলাম। বিন্ধ্যেশ্বরীজীকে জিঞ্জাসা করে আরও জেনে নিলাম যে এই দুটি কুটির গুণ মুগ্ধ গ্রামবাসীরাই তৈরী করে দিয়েছেন। একটিতে তিনি থাকেন, কুটিরের বারান্দাতে রান্নার কাজ হয়, অপর কুটিরটিতে ক্কচিৎ দু'চারজন আগন্তুক অতিথি এলে তাঁরা থাকেন।

বিন্ধ্যেশ্বরীজী এক হাঁড়ী গরম জল দিলেন। ভাল করে মুখ-হাত ধুয়ে বিছানা পেতে শুয়ে পড়লাম।ক্ষুধায় পেট চুঁই চুঁই করছে, ক্ষুধার চোটে বিছানায় উঠে বসলাম, পেট ভরে জল খেয়ে আবার শুলাম।সারাদিন পথ চলার পরিশ্রমে ঘুম আসতে দেরী হল না। কিন্তু শেষ রাত্রে ঘুম ভঙে গেল।কুটিরের দরজা খুলে পা টিপে টিপে বাইরে এসে আমলকী তলায় গিয়ে ঠারেশ্বরী মহারাজ কি করছেন,তা দেখবার আগ্রহ বা দুষ্ট বুদ্ধি মাথায় এল।গিয়ে দেখি তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, গাছের ডালে প্রদীপগুলো নিভে গেছে।কম্বল মুড়ি দিয়েও কনকনে ঠাণ্ডায় ঠক ঠক করে কাঁপছি, আর মহাত্মা নগ্নগাত্রেই তাঁর তপস্যা করে চলেছেন। একেই বলে উগ্র তপস্যা।নর্মদামাতার কৃপা এঁরা পাবেন না, ত কারা পাবেন? চিন্তা করতে করতে কুটীরে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঘুম যখন ভাঙল, তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে।দেখলাম, ঠারেশ্বরী মহারাজ সেই একইভাবে দণ্ডায়মান।বিন্ধ্যেশ্বরীজীর কাছে জিঞ্জাসা করে জানতে পারলাম যে আজ ২রা ফাল্গুন অর্থাৎ গতকাল ১লা ফাল্গুন হোসেঙ্গেবাদ জেলায় এসে পৌঁছেছি।পরিক্রমা শুরু করা থেকে চারমাস কেটে গেছে।শৌচাদি সেরে স্নান করতে গেলাম।স্নান তর্পণাদি সেরে আসার সময় দেখি প্রায় দশজন ভক্ত ভেট নিয়ে ঠারেশ্বরীজীকে প্রণাম করে নিজেদের আপন আপন সমস্যার কথা নিবেদন করছেন। মহাত্মা কোন উত্তর দিচ্ছেন না, নির্নিমেষনেত্রে নর্মদার দিকে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু নিজেদের কথা নিবেদন করেই ভক্তদেরকে সন্তুষ্ট দেখছি, দরবারে যখন পেশ করা হয়েছে তখন তাঁদের অভীষ্ট সিদ্ধি হবেই এই অবিচলিত নিষ্ঠা ও বিশ্বাস তাঁদের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। 

বিন্ধ্যেশ্বরীজী ভক্তদের আনা ফলমূল, বাজরা, জোয়ার, দুধ ইত্যাদি তিন জনের উপযোগী রেখে দিয়ে বাকী সব প্রসাদ হিসাবে বিলিয়ে দিলেন।নর্মদাশ্রয়ী সাধুর কোন বস্তু সঞ্চয় করে রাখতে নাহ, সেই বিধি কঠোরভাবে এখানে মানা হচ্ছে। আমি গোদারিয়া নদীর সংগম গুলজারী ঘাট দেখতে যাবো, বিন্ধ্যেশ্বরীজী আমার সঙ্গে যেতে পারবেন কিনা জিঞ্জাসা করায় তিনি বললেন,----দুপহরমেঁ ভোজনকে বাদ আপ্‌কা সাথ চলুঙ্গা।

মধ্যাহ্নের পূর্বেই ভোগ প্রস্তুত হয়ে গেল। বিন্ধ্যেশ্বরীজী অত্যন্ত যত্নসহকারে তাঁর গুরুদেবকে রুটি, ফল, দুধ একটু করে মুখে তুলে দিলেন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তিনি তা ভোজন করলেন, কুটিরের দ্বারে বসেই আমি সব লক্ষ্য করলাম। ভোজন পর্বের সময়েও দেখলাম, দৃষ্টি তাঁর নর্মদার দিকেই ন্যস্ত।একইভাবে ক্রমাগত দাঁড়িয়ে থাকলে যে কোন লোকেরই দু'পা আসাড় হয়ে যাবার কথা, ফুলে যাবার কথা, কিন্তু সত্তর বৎসর বয়স্ক ঠাড়েশ্বরী মহারাজের শরীর বয়সের তুলনায় অনেক সতেজ, অনেক সুস্থ এবং অনেক বলিষ্ঠ বলে মনে হল।খাওয়াদাওয়ার পর দুজনেই বেরিয়ে পড়লাম গুলজারীঘাটের উদ্দেশ্যে। 

To be Continued..........

Sunday, January 1, 2012


প্রলয় জলে মগ্ন ছিল বিশ্বজগৎ যবে, আদিম যুগে সৃষ্টি হবার আগে,
সেদিনের সেই অতল তলে দেখনা ভেবে, কারা ছিল গো জড়িয়ে অনুরাগে?
সেদিনের সেই সাগরপুরে সুপ্তিগড়ে যবে, সুপ্ত ছিলাম মুক্তা মুকুট পরি,
কেই বা সেদিন রাখল বুকে চেপে, চতুর্বাহুর আলিঙ্গনে ধরি।
জন্মে জন্মে যুগে যুগে লক্ষ জনম ধরে ঘুরেছি তো স্বর্গ-মর্ত্ত্য-সপ্তলোকের দেশে
সে সব জন্মে কেই বা বল আনলো মোদের মাটির মায়ের কোলে, যত্নে ভালবেসে?
কে আমাদের চলতে শিখায় আলোর পথে তুচ্ছ করে মরণ শতবার,
এর পরও কি বলতে হবে মাতা পিতাই সুধার সাগর, তাঁদের চরণ সকল পূজার সার?

https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191

Thursday, December 15, 2011



নর্মদা যেমন বয়ে চলে
সব পাষাণের ভাঁজে ভাঁজে,
সংঞ্জা যেমন প্রবাহিত
রক্ত মাংসের,শরীর মাঝে---
তেমনিতর মাতা পিতার
স্থূল দেহটাই তাঁর আবাস,
তাঁরাই আসল রসো বৈ সঃ
রসব্রহ্মের চিদ্‌বিলাস।




Tuesday, November 22, 2011



ঈশ্বর! ঈশ্বর! সারা বিশ্ব খুঁজিছে কাতরে,
লক্ষ লক্ষ পণ্ডিতের ভাষা নিরুত্তর;
ক্ষুদ্র প্রাণ দিশাহীন না পায় সন্ধান,
অসীমে ধরিতে গিয়া ব্যাকুল কাতর।
অনন্ত-জীবন-পথে চাহিনু বিস্ময়ে,
যোগ-যাগ করিবার লাগি ছুটে গেনু হিমালয় পানে,
কিন্তু তার অন্ত কোথা? না পাই সন্ধান কোনখানে,
জটিলতা বেড়ে যায় হৃদি মাঝখানে,
দর্শন কাঁদিয়া ফিরে সীমার লাগিয়া
বিঞ্জান সন্ধান করে তত্ত্ব নিশিদিন,
রূপ অরূপের পিছে ফিরিছে কাঁদিয়া---
সীমারে ঘিরিয়া বাজে অসীমের বীণ্‌!
দৈববাণী ভেসে এল-'জানিবারে চাও মোর সীমা?
মাতাপিতা মাঝে মূর্ত্ত হের, আমার মহিমা'।



Sunday, October 23, 2011



আমি নাই, তুমি নাই
আমি তুমি মিশে গেছি
অসীমে হারিয়ে গেছি
ভাষা নাই ভাব নাই
আমি নাই, তুমি নাই।
মিশে গেছি আলো ছায়া---
মিশে গেছে কায়া মায়া।
একাকার হয়ে গেছে,
সব আছে, কিছু নাই।
চাওয়া পাওয়া কারে বলে
সে ত কিছু জানি না।
জপ তপ কারে বলে
সেও ত হায় বুঝি না।
নিত্যানিত্য যারা বোঝে
আসল নকল তারা খোঁজে,
বোঝাবুঝি খোঁজাখুঁজির
আমার কোন নাই বালাই
আমি নাই, তুমি নাই।





আহাম্মকঃ---


আহাম্মক এক, যৌবনে নেয় ভেক !
আহাম্মক দুই, গুরুজনকে বলে তুই !
আহাম্মক তিন, আপন কড়ি পরকে দিয়ে নিজে করে ঋণ !
আহাম্মক চার, মাকে ধরে মার !
আহাম্মক পাঁচ, পরের পুকুরে ছাড়ে মাছ !
আহাম্মক ছয়, এর কথা ওকে কয় !
আহাম্মক সাত, নিচের ঘরে খায় 
ভাত!

আহাম্মক আট, বৌ-ঝিকে পাঠায় হাট !
আহাম্মক নয়, পিছনে কথা কয় !
আহাম্মক দশ, বৌ-এর কথায় বশ !



https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191