Thursday, January 19, 2012

খাড়েশ্বরী মহারাজঃ---


......বেলা অনেকখানি বেড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে, কেননা প্রায় পাঁচটা বাজতে চলল, এখনও সূর্য সম্পূর্ণতঃ অন্ত যায় নি। এখনও পথঘাট, পাহাড়, পাহাড়ের গাছপালা সব স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি। অবশেষে গুলজা গ্রামে এসে পৌঁছে গেলাম।

ছোট ছোট ছেলেরা একটা খেলার মাঠে খেলা করছিল ছোট একটা বল নিয়ে।একজন লোক তাদেরকে খেলা ছেড়ে ঘরে ফিরতে তাড়া দিচ্ছে---'অব বস্‌ করো জী। খেল্‌ ছোড়কে ঘর মে চলো।' খেলা ছেড়ে ঘরে ফেরাই ত আসল কথা, লাখ কথার এক কথা। একবার একটি ধোপা মেয়ে তার বাবাকে বলছিল---'বেলা গেল, বাস্‌নায় আগুন দাও'--- সেই কথা শুনেই লালাবাবুর মনে তীব্র বৈরাগ্যের উদয় হল, তিনি সঙ্গে সঙ্গে অগাধ ঐশ্বর্য ত্যাগ করে বৃন্দাবনে গিয়ে ভজনে ডুবে গেলেন। আমি ত আর লালাবাবু নহ, কাজেই ছেলেদের প্রতি লোকটির উক্তি যতই গভীর অর্থবহ হোক না কেন, আমার মনে ভাবান্তর ঘটল না। আমার এখন রাত্রির জন্য আশ্রয় প্রয়োজন, বিশ্রাম প্রয়োজন।

লোকটির কাছে তারই সন্ধান চাইলাম। তিনি বললেন--- আধা ঘণ্টা চলনেসে আপ্‌ গোদারিয়া সংগম গুলজারীঘাটমেঁ পঁহুজ যায়েগা।উধর মন্দির ভি হ্যায়,পরিক্রমাবাসীয়োঁ কে লিয়ে আচ্ছা ইন্তেজান ভি হ্যায়।

---'ইধর কোঈ মন্দির নেহি হ্যায়? হম্‌ বহোৎ থক্‌ গিয়া।'

---হমারা ছোটিসি মহল্লামেঁ মন্দির নেহি হ্যায়, কেঁওকি গুলজারীঘাট বহোৎ নজদিগ্‌ হ্যায়, উধর শিউজীকা আচ্ছা মন্দির হ্যায়, হম্‌লোগ্‌ উধরই পূজা করতা হুঁ। তব্‌ চলিয়ে ঠাড়েশ্বরী মহারাজকা পাশ, উনকা কোঠিমেঁ জাগাহ্‌ মিলেগা।মিনিট তিনেক হেঁটে নর্মদার ধারে ঠাড়েশ্বরী মহারাজের কাছে পৌঁছে গেলাম।

দেখলাম, একটি আমলকী গাছের কাছে এক ছয় ফুট দীর্ঘদেহী সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে আছেন।ছোট ছোট চারাগাছকে গরু ছাগলের গ্রাস হতে রক্ষা করার জন্য কাঠ বা বাঁশের যেমন কুণ্ডল দিয়ে ঘিরে রাখা হয় সেইরকম এক কাঠের কুণ্ডলের মাঝখানে ঠারেশ্বরী মহারাজ দাঁড়িয়ে আছেন।

নগ্ন গাত্র, কোমরে জড়ানো আছে এক টুকরো গৈরিক বস্ত্র।অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন নর্মদার দিকে।মৃদু কণ্ঠে জপ করে চলছেন সেই একই নাম, মহানাম-রেবা, রেবা, রেবা। আমলকী গাছের ডালে আকাশ প্রদীপের মত আট দশটা প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ ঝুলছে।সেই আলোতে দেখলাম-পাশাপাশি দুটি কুটির আছে।

আমার সঙ্গী লোকটি 'গোড় লাগি মহারাজ' বলে সশব্দে যুক্তকরে প্রণাম করতেই সেই শব্দ শুনে কুটির থেকে একজন গেরুয়াধারী বেরিয়ে এলেন। তিনি লোকটির কাছে আমি আশ্রয়প্রার্থী জেনে আমাকে দ্বিতীয় কুটিরটিতে থাকবার ব্যবস্থা করে দিলেন।কথায় কথায় জেনে নিলাম এই সাধুর নাম বিন্ধ্যেশ্বরী, তিনি ঠারেশ্বরী মহারাজের শিষ্য এবং সেবক।

ঠাড়েশ্বরী মহারাজকে কেউ কেউ খাড়েশ্বরী মহারাজ বলেও সম্বোধন করে থাকেন।

এই গুলজা গ্রামে নর্মদাতীরে তিনি এইরকম দাঁড়ানো অবস্থাতেই কুড়ি বছর ধরে তপস্যা করছেন।কেউ কখনও তাঁকে এইরকম দণ্ডায়মান অবস্থা ছাড়া বসা বা শোয়া অবস্থায় দেখে নি, দিবারাত্র সঙ্গে থেকে তিনিও দেখেন নি।ঐ রকম অবস্থাতেই তিনি শৌচাদি এবং ভোজন কর্মাদি সেবকের সাহায্যে করে থাকেন।

বিন্ধ্যেশ্বরীজীর সঙ্গে নিতান্ত প্রয়োজনে দু'একটা কথা ছাড়া আর কারও সঙ্গে কোন কথাবার্তা বলেন না।শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, সর্ব ঋতুতে তিনি নগ্নগাত্রে দাঁড়িয়ে থেকে নিরন্তর রেবা মন্ত্র জপ করে চলেছেন।
বিন্ধ্যেশ্বরীজী অত্যন্ত শ্রদ্ধাপ্লুত কণ্ঠে সাগ্রহে আমাকে জানালেন---মেরে গুরুজীকে পাশ সবকিছু ঋদ্ধি-সিদ্ধি হ্যায়। দেহাত সে বহোৎ আদমী ইধর আতা হৈ মাথা টেকতা হৈ ঔর চলা যাতা হৈ।ব্যাস্‌, ইসীসে উনলোগোঁকা দিল্‌কা বাসনাকি পূর্তি হো জাতা হৈ। অপ্‌ ইধর আজ আয়েঙ্গে, এবাত্‌ পহেলেসে উনোনে বাতা দিয়া হৈ। ইসি ওয়াস্তে এ কামরা ভি আপ্‌কো লিয়ে খালি করকে রাখ্যা হৈ।

এই কথা শুনে আমি খুবই অবাক হলাম। বিন্ধ্যেশ্বরীজীকে জিঞ্জাসা করে আরও জেনে নিলাম যে এই দুটি কুটির গুণ মুগ্ধ গ্রামবাসীরাই তৈরী করে দিয়েছেন। একটিতে তিনি থাকেন, কুটিরের বারান্দাতে রান্নার কাজ হয়, অপর কুটিরটিতে ক্কচিৎ দু'চারজন আগন্তুক অতিথি এলে তাঁরা থাকেন।

বিন্ধ্যেশ্বরীজী এক হাঁড়ী গরম জল দিলেন। ভাল করে মুখ-হাত ধুয়ে বিছানা পেতে শুয়ে পড়লাম।ক্ষুধায় পেট চুঁই চুঁই করছে, ক্ষুধার চোটে বিছানায় উঠে বসলাম, পেট ভরে জল খেয়ে আবার শুলাম।সারাদিন পথ চলার পরিশ্রমে ঘুম আসতে দেরী হল না। কিন্তু শেষ রাত্রে ঘুম ভঙে গেল।কুটিরের দরজা খুলে পা টিপে টিপে বাইরে এসে আমলকী তলায় গিয়ে ঠারেশ্বরী মহারাজ কি করছেন,তা দেখবার আগ্রহ বা দুষ্ট বুদ্ধি মাথায় এল।গিয়ে দেখি তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, গাছের ডালে প্রদীপগুলো নিভে গেছে।কম্বল মুড়ি দিয়েও কনকনে ঠাণ্ডায় ঠক ঠক করে কাঁপছি, আর মহাত্মা নগ্নগাত্রেই তাঁর তপস্যা করে চলেছেন। একেই বলে উগ্র তপস্যা।নর্মদামাতার কৃপা এঁরা পাবেন না, ত কারা পাবেন? চিন্তা করতে করতে কুটীরে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঘুম যখন ভাঙল, তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে।দেখলাম, ঠারেশ্বরী মহারাজ সেই একইভাবে দণ্ডায়মান।বিন্ধ্যেশ্বরীজীর কাছে জিঞ্জাসা করে জানতে পারলাম যে আজ ২রা ফাল্গুন অর্থাৎ গতকাল ১লা ফাল্গুন হোসেঙ্গেবাদ জেলায় এসে পৌঁছেছি।পরিক্রমা শুরু করা থেকে চারমাস কেটে গেছে।শৌচাদি সেরে স্নান করতে গেলাম।স্নান তর্পণাদি সেরে আসার সময় দেখি প্রায় দশজন ভক্ত ভেট নিয়ে ঠারেশ্বরীজীকে প্রণাম করে নিজেদের আপন আপন সমস্যার কথা নিবেদন করছেন। মহাত্মা কোন উত্তর দিচ্ছেন না, নির্নিমেষনেত্রে নর্মদার দিকে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু নিজেদের কথা নিবেদন করেই ভক্তদেরকে সন্তুষ্ট দেখছি, দরবারে যখন পেশ করা হয়েছে তখন তাঁদের অভীষ্ট সিদ্ধি হবেই এই অবিচলিত নিষ্ঠা ও বিশ্বাস তাঁদের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। 

বিন্ধ্যেশ্বরীজী ভক্তদের আনা ফলমূল, বাজরা, জোয়ার, দুধ ইত্যাদি তিন জনের উপযোগী রেখে দিয়ে বাকী সব প্রসাদ হিসাবে বিলিয়ে দিলেন।নর্মদাশ্রয়ী সাধুর কোন বস্তু সঞ্চয় করে রাখতে নাহ, সেই বিধি কঠোরভাবে এখানে মানা হচ্ছে। আমি গোদারিয়া নদীর সংগম গুলজারী ঘাট দেখতে যাবো, বিন্ধ্যেশ্বরীজী আমার সঙ্গে যেতে পারবেন কিনা জিঞ্জাসা করায় তিনি বললেন,----দুপহরমেঁ ভোজনকে বাদ আপ্‌কা সাথ চলুঙ্গা।

মধ্যাহ্নের পূর্বেই ভোগ প্রস্তুত হয়ে গেল। বিন্ধ্যেশ্বরীজী অত্যন্ত যত্নসহকারে তাঁর গুরুদেবকে রুটি, ফল, দুধ একটু করে মুখে তুলে দিলেন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তিনি তা ভোজন করলেন, কুটিরের দ্বারে বসেই আমি সব লক্ষ্য করলাম। ভোজন পর্বের সময়েও দেখলাম, দৃষ্টি তাঁর নর্মদার দিকেই ন্যস্ত।একইভাবে ক্রমাগত দাঁড়িয়ে থাকলে যে কোন লোকেরই দু'পা আসাড় হয়ে যাবার কথা, ফুলে যাবার কথা, কিন্তু সত্তর বৎসর বয়স্ক ঠাড়েশ্বরী মহারাজের শরীর বয়সের তুলনায় অনেক সতেজ, অনেক সুস্থ এবং অনেক বলিষ্ঠ বলে মনে হল।খাওয়াদাওয়ার পর দুজনেই বেরিয়ে পড়লাম গুলজারীঘাটের উদ্দেশ্যে। 

To be Continued..........

Sunday, January 1, 2012


প্রলয় জলে মগ্ন ছিল বিশ্বজগৎ যবে, আদিম যুগে সৃষ্টি হবার আগে,
সেদিনের সেই অতল তলে দেখনা ভেবে, কারা ছিল গো জড়িয়ে অনুরাগে?
সেদিনের সেই সাগরপুরে সুপ্তিগড়ে যবে, সুপ্ত ছিলাম মুক্তা মুকুট পরি,
কেই বা সেদিন রাখল বুকে চেপে, চতুর্বাহুর আলিঙ্গনে ধরি।
জন্মে জন্মে যুগে যুগে লক্ষ জনম ধরে ঘুরেছি তো স্বর্গ-মর্ত্ত্য-সপ্তলোকের দেশে
সে সব জন্মে কেই বা বল আনলো মোদের মাটির মায়ের কোলে, যত্নে ভালবেসে?
কে আমাদের চলতে শিখায় আলোর পথে তুচ্ছ করে মরণ শতবার,
এর পরও কি বলতে হবে মাতা পিতাই সুধার সাগর, তাঁদের চরণ সকল পূজার সার?

https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191

Thursday, December 15, 2011



নর্মদা যেমন বয়ে চলে
সব পাষাণের ভাঁজে ভাঁজে,
সংঞ্জা যেমন প্রবাহিত
রক্ত মাংসের,শরীর মাঝে---
তেমনিতর মাতা পিতার
স্থূল দেহটাই তাঁর আবাস,
তাঁরাই আসল রসো বৈ সঃ
রসব্রহ্মের চিদ্‌বিলাস।




Tuesday, November 22, 2011



ঈশ্বর! ঈশ্বর! সারা বিশ্ব খুঁজিছে কাতরে,
লক্ষ লক্ষ পণ্ডিতের ভাষা নিরুত্তর;
ক্ষুদ্র প্রাণ দিশাহীন না পায় সন্ধান,
অসীমে ধরিতে গিয়া ব্যাকুল কাতর।
অনন্ত-জীবন-পথে চাহিনু বিস্ময়ে,
যোগ-যাগ করিবার লাগি ছুটে গেনু হিমালয় পানে,
কিন্তু তার অন্ত কোথা? না পাই সন্ধান কোনখানে,
জটিলতা বেড়ে যায় হৃদি মাঝখানে,
দর্শন কাঁদিয়া ফিরে সীমার লাগিয়া
বিঞ্জান সন্ধান করে তত্ত্ব নিশিদিন,
রূপ অরূপের পিছে ফিরিছে কাঁদিয়া---
সীমারে ঘিরিয়া বাজে অসীমের বীণ্‌!
দৈববাণী ভেসে এল-'জানিবারে চাও মোর সীমা?
মাতাপিতা মাঝে মূর্ত্ত হের, আমার মহিমা'।



Sunday, October 23, 2011



আমি নাই, তুমি নাই
আমি তুমি মিশে গেছি
অসীমে হারিয়ে গেছি
ভাষা নাই ভাব নাই
আমি নাই, তুমি নাই।
মিশে গেছি আলো ছায়া---
মিশে গেছে কায়া মায়া।
একাকার হয়ে গেছে,
সব আছে, কিছু নাই।
চাওয়া পাওয়া কারে বলে
সে ত কিছু জানি না।
জপ তপ কারে বলে
সেও ত হায় বুঝি না।
নিত্যানিত্য যারা বোঝে
আসল নকল তারা খোঁজে,
বোঝাবুঝি খোঁজাখুঁজির
আমার কোন নাই বালাই
আমি নাই, তুমি নাই।





আহাম্মকঃ---


আহাম্মক এক, যৌবনে নেয় ভেক !
আহাম্মক দুই, গুরুজনকে বলে তুই !
আহাম্মক তিন, আপন কড়ি পরকে দিয়ে নিজে করে ঋণ !
আহাম্মক চার, মাকে ধরে মার !
আহাম্মক পাঁচ, পরের পুকুরে ছাড়ে মাছ !
আহাম্মক ছয়, এর কথা ওকে কয় !
আহাম্মক সাত, নিচের ঘরে খায় 
ভাত!

আহাম্মক আট, বৌ-ঝিকে পাঠায় হাট !
আহাম্মক নয়, পিছনে কথা কয় !
আহাম্মক দশ, বৌ-এর কথায় বশ !



https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191

"মাণ্ডবগড় কেল্লা" ------


".......... ঠিক, ঠিক এইসময় মাণ্ডবগড় কেল্লার পাশ থেকে আমরা সবাই কারও কণ্ঠস্বর শুনে উৎকর্ণ হয়ে উঠলাম। কেউ যেন গান গাইতে গাইতে আসছেন। তাঁর গলার স্বর গানের সুরে ভেসে আসছে---

গগনে জাগিল মহাকাল।
ঘন ডম্বরু বাজে ভীম রুদ্র সাজে
জাগে ভৈরব জাগে মৃত্যু করাল।
গগনে জাগিল মহাকাল।।
মাভৈঃ! মাভৈঃ!
তাথৈ! তাথৈ! তা তা থৈ, তা তা থৈ!
জাগে ভৈরব জাগে মৃত্যু করাল।
মরণ-আঁধার কোলে, জীবন আলোকে জ্বলে
শংকর শিব সাজে সাজিয়ে দয়াল।
মাভৈঃ! মাভৈঃ! মাভৈঃ! মাভৈ!


কণ্ঠস্বর যতই এগিয়ে আসছে, ততই আমার মহাত্মা সোমানন্দেরই কণ্ঠস্বর বলেই মনে হচ্ছে ! কিন্তু তা কি করে সম্ভব। তিনি ত এখন চব্বিশ অবতারে কিংবা সেই সীতামায়ীর বনে বসে আছেন। এখানে বসে তাঁর গলা শুনব কি করে? যাঁর কণ্ঠস্বর শুনলাম তাঁকে এখনও চোখে দেখতে পাচ্ছি না। আবার কণ্ঠস্বর ভেসে এল, এবারে আরও স্পষ্ট ---


গরজ়ে গম্ভীর গগনে কম্ভু! নাচিছে সুন্দর নাচে স্বয়ম্ভূ।
সে নাচ হিল্লোলে জটা আবর্তনে সাগর ছুটে আসে গগন-প্রাঙ্গনে!
আকাশে শূলহানি, শোনাও কৃপাবাণী, তরাসে কাঁপে প্রাণী, প্রসীদ শম্ভু।।

পাহাড় বেয়ে দুটো ঝাঁকড়া আবলুষ গাছের পাশ দিয়ে আমাদের সামনে উঠে আসতেই মোহান্তজী এবং লক্ষ্মণভারতীজী আনন্দে ফিস্‌ ফিস্‌ করে বলে উঠলেন ---- সীতা বনকী মহাপুরুষ ইধর ক্যায় সে পধারেঁ ? আমি ত তাঁকে দেখে আনন্দে আত্মহারা! 'বন্দে মহাপুরুষ্য চরণারবিন্দম্‌, ,বন্দে মহাপুরুস্য চরণারবিন্দম্, নমো নারায়ণায়' বলে সবাই কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁকে আমরা প্রণাম করলাম দূর থেকে। তাঁর আমাদের দিকে নজর পড়ল বলে মনে হল না। তাঁর পূর্বের মতই শতচ্ছিন্ন পোষাক, ঝাঁপড় ঝাঁপড় চুল এবং ছোট ছোট জটা দুলাতে দুলাতে তিনি টলতে টলতে গান গাইতে গাইতে এগিয়ে আসছেন-----


ললাট-শশী টলি জটায় পড়ে ঢলি,
সে শশী-চমকে গো বিজুলি ওঠে ঝলি,
ঝাঁপে নীলাঞ্চলে মুখ দিগঙ্গনা,
মূরছে ভয়ভীতা নিশি নিরঞ্জনা
আঁধারে পথ-হারা ভকত কেঁদে সারা,
যাচিছে কৃপাধারা প্রসীদ শম্ভু!


নাচতে নাচতে পাথরের উপর পায়ের তাল ঠুকতে বলতে থাকলেন---


তাথৈ, তাথৈ, তা-তা-থৈ, তা-তা-থৈ,
মাভৈঃ! মাভৈঃ! প্রসীদ শম্ভু ! প্রসীদ শম্ভু ! 

আমার আর তর সইলো না। তাঁর সেই অবস্থাতেই আমি নিভন্ত দুটো ধুনির মাঝখান দিয়ে কোনমতে পেরিয়ে তাঁর কাছাকাছি গিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে ত্র্যস্ত ব্যস্ত হয়ে বলতে লাগলাম, সামনের দিকে তাকিয়ে দেখুন চোদ্দটা কালো চিতা আমাদেরকে আক্রামণ করার জন্য বসে আছে, আমাদেরকে বাচাঁন!' আমার কথায় চমকে উঠেই সেইখানেই একটা পাথরের উপর বসে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে অট্টহাসি। সে কি হাসি! হাসির দমকে দমকে তিনি দুলতে দুলতেই বলতে থাকলেন ---

'চোখ মেললে সকলই পাই, চোখ মুদলে কিছুই নাই। দিনে সৃষ্টি, রেতে লয়, নিরন্তর ত এই-ই হয়।'

'যম বেটা হায় দুমুখো থলি, তাই বেটার আঁৎ খালি। বেটা কেবল খাচ্ছে, খাচ্ছে, খাচ্ছে, ওর পেটে কি কিছু থাকছে! হাঁ, হাঁ কিছু থাকছে!'
'বলি ও বামুন ছানা! তুই এখানে এলি কি করে? রাঁধুনী নাই ত রাঁধালে কে, রান্না নেই ত সবাই খাচ্ছেন কি? আরে বুঝিস না কেন, যে রাঁধলে সেই ত খেলে এই ত দুনিয়ার ভেল্কি।'

এইভাবে কথা বলতে বলতেই তিনি মোহান্তজীর দিকে তাকিয়ে আমাকে বলতে লাগলেন --- 'ওহো তুই ঐ রাত ভিখারীটার দলে ভিড়ে এখানে পৌঁছে গেছিস! ভাল, ভাল



* রাত ভিখারির ধামাধরা থাকে একজন
হরিনাম বলে না মুখে, চাল কড়ি কুড়াতে তার মন! 

এই বলেই তিনি আবার হেসে লুটোপুটি! 'ওহে রাত ভিখারি বাবু! 


রাত ভোর ত গুরুর কাছে মাথা ঠুকলি আর ভিখ চাইলি, সকাল হতেই "হর নর্মদে"! আরে গুরুশক্তি আবার পারে না কি? আরে বেটা! যেই হর, সেই গুরু, সেই নর্মদা। সঙ্কটকালে তোর মন তিনদিকে ছুটবে কেন? গুরুকে ধরে সকলেই জয়, নয়ত সব লয়! ঐ যে কথায় আছে না? 


দেবতা থাকুক শত শত গুরু করব সার, 
গুরুর মধ্যেই কৃপার প্রকাশ দেবী আর দেবার। 

'তাই বলি মাঝি! গুরুর শরণ লও, কেন তুফান পানে চাও, হাল ধরে আছেন গুরু নিরঞ্জন! ফড়্যা যারা, মজবে তারা, বাটখারা যাদের কম, ধরে তসিল করবে যম আর গদিয়ান জহুরী যারা, দেখ গে তারা বসে বসে ব্যাপার করছে গুরুর প্রেম রতন।' 

'আমি বাপু স্বরূপের বাজারে থাকি। শোনরে খেপা, বেড়াস একা, চিন্তে নারলে ধরবি কি? কালার সঙ্গে বোবার কথা হয়, কালা গিয়ে শরণ মাগে কে পাবে নির্ণয়! আর অন্ধ যেয়ে রূপ নেহারে তার মর্মকথা বলব কি! মড়ার সঙ্গে মড়া ভেসে যায়,জীয়ান্ত ধরতে গেলে হাবুডুবু খায়। ওরে, সে মড়া নয়কো রসের গোড়া, তার রূপেতে দিয়ে আঁখি, আমি এখন রূপ দেখি!' 


এই বলে পাগলা সাধু চুপ করে বসে চোখ বন্ধ করে দুলতে থাকলেন। তাঁর দুলুনি আর থামতে চায় না। আমরা পড়লাম মহা ফাঁপরে। রাতভর আমরা ভয়ে ভয়ে কাটিয়েছি, আগুনের তাপে জর্জরিত হয়েছি। এখন দেখতে পাচ্ছি কালো চিতা গুলো মুখ ব্যাদন করে সবাই খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে হচ্ছে এবারে আক্রমণের উদ্যোগ করছে, এবারে নির্ঘাৎ ঝাঁপিয়ে পড়বে। অমিত শক্তিধর এই মহাপুরুষকে দেখে আমাদের বুকে আশা ভরসা জেগেছিল কিন্তু ইনি ত প্রথম থেকেই ভাবের রাজ্যে বিচরণ করছেন। এখন ত একেবারে মস্ত। 


সবচেয়ে বিপদের কথা, এর ভাবের খেলা এতক্ষণ তন্ময় হয়ে আমরা দেখছিলাম, মশাল গুলোর দিকে লক্ষ্য করি নি সেগুলো সব নিভতে বসেছে। আমি মরিয়া হয়ে তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে চেচিয়ে বললাম মা রেবার দোহাই, সীতামায়ীর দোহাই আপনি আমাদের দিকে একটু নজর দিন, কালো চিতার দল আমাদের উপর  ঝাঁপিয়ে পড়ল বলে। আমার চিৎকারে তিনি চমকে উঠেই কালো চিতাগুলোর দিকে ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন। 


তাকিয়ে তাকিয়ে বলতে লাগলেন --- ওকারের বুড়ো যে অগস্ত্যি গুহায় তোকে যে বেদ মন্ত্রটা শিখালো সেটা একবার আউড়িয়ে দেখ না। এখনই বেটাদের নড়ন চড়ন থাকবে না।


---- আমি তা আওড়াবার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু কিছুতেই বেদ মন্ত্র স্মরণে আনতে পারি নি।
---- তা হলে ত তোর বেটা রাবণের দশা! রাবণ বেটাও মরণকালে সব অস্ত্র ভুলে গেছিল। অতবড় মহাবীর কর্ণ সে বেটারও মৃত্যুকালে রথচক্র মেদিনী গ্রাস করল। পরশুরামের দেওয়া ব্রহ্মাস্ত্রও ভুলে গেল। বুঝলি রে, এসবই সেই নিয়তি হারামজাদীর খেল! 

আমার আর ধৈর্য রইল না, যে কাজ কখনও করিনি, তাঁর এতসব আদিখ্যেতায় অধীর হয়ে সেই কাজই করে বসলাম। তাঁর দুই কাঁধ স্পর্শ করে ঝাঁকিয়ে দিতে দিতে বললাম ,'তবে এই নিয়তির মুখে আপনাকেই ছুঁড়ে ফেলে দেব।' 


এত বড় উচ্চকোটি মহাপুরুষের সঙ্গে আমাকে এইরকম বেয়াদপি করতে দেখে সকলেই হকচকিয়ে গেছেন। মোহান্তজী চুপি চুপি কণ্ঠে আমাকে ধমকে উঠলেন --- 'ক্যা পাগলপন কর রহে হো।' 


কিন্তু সেদিকে কান দেওয়ার সময় নেই। মহাপুরুষ সবেগে উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাতের বদ্ধমুষ্ঠি আস্ফালন করতে করতে কালো চিতাদের দিকে এগোতে এগোতে বললেন ---"কী তোদের কে আমি বলে দিয়েছি না,বামুনের মাংস তিতা হয়। সাধুদের মাংস বিষ !বিষ! চাবল মারবি কি সঙ্গে সঙ্গে অক্কা! দেখছিস না, তোদেরই এক বড় কুটুম ইমলি গাছের তলায় কেমন চিৎপটাং হয়ে পড়ে আছে। পালা পালা নয়ত সকলেই চিৎপটাং হবি!" 


জানোয়ারগুলো কি বুঝল জানি না, আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, মহাপুরুষ যতই এগোচ্ছেন, তারা ততই পিছিয়ে যাচ্ছে। তারপর তারা দুড়দাড় শব্দে বন বাদাড় ভেদ করে দৌড়ে পালাল। মহাপুরুষ কিন্তু থামলেন না, তিনি এগিয়ে চললেন। আমরা সকলেই তাঁর পিছন পিছন হাঁটতে লাগলাম।"