Monday, September 1, 2014


Cont (Last) ............


তারপর মন্দিরে ঢুকে পাশাপাশি অবস্থিত ভূতনাথ নামে অভিহিত তিনটি শিবলিঙ্গকে আমি আমার মত করে পূজা করতে আরম্ভ করলাম। শিব তিনটিতে জল ঢেলে মার্জনা করছি, এমন সময় দেখলাম ১২ টি বার রকমের পাখী নানারকম শব্দ যথা --- কেউ কিচিরমিচির, কেউ টুংটুং, কেউ টিয়ার মত বুলি, কেউ ট্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ করতে করতে মন্দিরের চারপাশে ঘুরপাক খেতে লাগল। আমি সেই পক্ষীকুলের কলতানের মধ্যে পূজা করতে লাগলাম ভূতনাথের। পূজা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এমন সময় মুখ তুলে দেখি, 'ঠুক্‌ ঠুক্‌' লাঠির শব্দ করতে করতে মহাত্মা ফিরে এসেছেন। একটি শাল পাতায় মোড়া এক ডেলা ছানা ও তিনটি কলা ভূতনাথের সম্মুখে রেখে ভোগ নিবেদনের ইঙ্গিত করলেন। আর একটি শাল পাতায় মোড়া পৃথক এক ডেলা ছানা নিয়ে তা ভেঙ্গে ভেঙ্গে পাখীদের মধ্যে বিলোতে লাগলেন।


পাখীরা তাঁর হাতের উপর কাঁধের উপর বসে ঠুকরে ঠুকরে খুঁটে খুঁটে খেতে লাগল। আমার ভোগ নিবেদনও শেষ হল, পাখীরাও তাঁর হাতে ছানা খেয়ে উড়ে গেল বনে। একটা জিনিষ লক্ষ্য করলাম, তিনি ভোগ নিয়ে আসার পূর্বে মন্দিরের মধ্যে ঢুকেও কয়েকটা পাখী যত্রতত্র নেচে বেড়াচ্ছিল, কিন্তু তিনি এসে পৌঁছানো মাত্রই সকলে তাঁকেই ঘিরে ছিল। তাঁর হাতের ছানা শেষ হয়ে গেলেও শিবলিঙ্গের সামনে ছানা শাল পাতাতে থাকলেও কোন পাখী স্বাভাবিক প্রবৃত্তি বশে সেদিকে দৃকপাতও করল না।


পূজা ও প্রণাম করে দরজার বাইরে এসে তাঁর পায়ে ফুল চাপিয়ে সাষ্টাঙ্গে ভক্তি নিবেদন করলাম। তখন থেকে মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন উঁকি মারছে, ভারোচে ইনি দেখা দিয়েছিলেন কিনা জিঞ্জাসা করি, কিন্তু খুবই অশোভন হবে বলে জিঞ্জাসা করতে সাহস করলাম না। ভাবলাম, একই গান উভয়ের মুখে শুনেছি বলে যে উভয়েই একই ব্যক্তি হবেন, এমন কোন কথা নেই। একই গানের ভাষা দুজন কেন দুশ জনেরও জানা থাকতে পারে!


---- লেও শৈলেন্দ্রনারায়ণজী! ভুতনাথজীকে কা পরসাদী পা লিজিয়ে।


আমার চিন্তাসূত্র ছিন্ন হল। তিনি কিছু গ্রহণ করবেন কিনা বলতে যাবো, এমন সময় তিনি নিজেই বলে উঠলেন --- লেওজী, ইধর বৈঠকে পা লিজিয়ে, করীব এক বাজ গিয়া হোঙ্গে। আপ তো জানতে হো, হম্‌ কুছ্‌ লেতে নেহি।


সশব্দে একটা উদ্‌গার তুলে বললেন --- কয় রোজ পহেলে ভারভূতি মেঁ ভারভূতেশ্বর জী মুঝে জবর দস্তিসে বহোৎ কেলা ঔর নড়াইল খিলায়ে থা। আভি শ' সাল ইসীমেঁ বীত জায়েঙ্গে।


আমার সংশয় মোচন হল, আমি ভূতনাথের প্রসাদ খেয়ে নিলাম।"




ভূতনাথের মন্দির ---

স্মরণাতীতকাল পূর্বে ঐ ভূতনাথের স্থানে একজন শৈব মহাযোগীর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব স্বয়ম্ভূলিঙ্গ রূপে প্রকট হন। শিবলিঙ্গ আবির্ভাবের কালে আকাশ মণ্ডল ভেদ করে তাঁর কাছে একটি একাক্ষরী দিব্যমন্ত্র প্রকট হয়। আনন্দে অভিভূত হয়ে সেই মহাযোগী প্রচণ্ড উল্লাসে নৃত্য করতে করতে প্রাণপণে চিৎকার করে ঐ বীজ দুবার উচ্চারণ করেন এবং অপার বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেন যে, পূর্বোক্ত শিবলিঙ্গের পাশে আরো দুটি স্বয়ম্ভু লিঙ্গ সঙ্গে সঙ্গে প্রকট হয়েছে। জাপ্য মূলবীজকে প্রকাশ্যে উচ্চারণ করায় সেখানে তৎক্ষণাৎ নন্দী, ভৃঙ্গী, বীরভদ্র, ঘণ্টাকর্ণ বহুতর রুদ্রপিশাচের আবির্ভাব ঘটে।


নিয়মবিরুদ্ধ কাজের জন্য চিরতরে তাঁর জিহ্বা স্তব্ধ হয়। তিনি অতঃপর যতকাল জীবিত ছিলেন ততদিন সংকেতে বা লিখে লিখে সমাগত ভক্তদের কাছে মনের ভাব প্রকাশ করতেন। তাঁর তপস্যার প্রভাবে ভূতনাথ মহাদেবের আবির্ভাব ঘটেছিল বলে, তাঁকে লোকে ভূতনাথ বাবা বলে ডাকতেন।


এই মহাযোগীর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁর সামনে কেউ এসে পৌঁছালেই সেই ভক্তের মনে এবং জিহ্বায় আপনা হতেই মহাদেবের একাক্ষরী মহাবীজ স্ফুরিত হত।


কালক্রমে তাঁকে কেন্দ্র করেই একটি বিরাট আখড়া গড়ে ওঠে। আখড়ার নাম হয় ভূতনাথ আখড়া। রুখড়, সুখড় এবং অগন নামক আখড়া এই ভূতনাথ আখড়ারই অন্তর্গত। তাঁর সন্ন্যাসী শিষ্যরা কারিগরী কৌশলে ভূতনাথ মন্দিরের চারদিকে সারি সারি গাছ লাগিয়ে "লক্ষ্মৌ এর ভুলভুলাইয়া" নির্মাণ করেছিলেন। সেইসব গাছপালা ক্রমে জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। "লক্ষ্মৌ এর ভুল ভুলাইয়াতে" প্রবেশ করে সাধারণ যাত্রী যেমন বিভ্রান্ত হয়, সঠিক পথ সহজে খুঁজে পায় না, তেমনি ভূতনাথের জঙ্গলে প্রবেশ করে পথ খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য।


রুদ্রপিশাচ বা ভূত প্রেতাদির গল্প সম্পূর্ণ কুসংস্কার প্রসূত। যেখানে ভূত আছে সেখানে ভূতনাথও আছেন।



https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191


".......................  বেলা তখন ৮টা বেজেছে। চমৎকার মিষ্টি রোদে হাঁটতে ভালই লাগছে। দূরে দূরে জনবসতিপূর্ণ শস্যশ্যামল গ্রাম দেখতে দেখতে মনের আনন্দে  হেঁটে চলেছি; আনন্দের কারণ আজ হরিধামে পৌঁছে যাব। আজ না নৌকা পেলেও কাল নিশ্চয়ই নৌকা পেয়ে যাব। মহাত্মা পূষণ গিরিজীর ছাড়পত্র অর্থাৎ নৌকার চিঠি ত কাছেই আছে, ভাবনা কি। প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা হাঁটার পর সামনে জঙ্গল দেখে থমকে দাঁড়ালাম। বুকটা ধ্‌ক করে উঠল। ভূতনাথের জঙ্গল।


ভূতনাথের জঙ্গল যেখানে জনশ্রুতি রুদ্রপিশাচের বাস। রুদ্রপিশাচ থাকুন না থাকুন, সকলের মুখে শুনে আসছি এটি ভয়ঙ্কর স্থান! গতবার মোহান্তজীর সঙ্গে নিজেই ত দেখে গেছি, ভূতনাথের মন্দিরে পৌঁছতে কত ঘুরপাক খেতে হয়েছে। সোজা জঙ্গল অতিক্রম করে যাওয়ার উপায় নেই। নিরাপদে সমুদ্র পেরোতে হলে প্রত্যেক পরিক্রমাবাসীকে ভূতনাথের মন্দিরে প্রণাম ঠুকে যেতেই হবে। তা না হলে সমুদ্রে নৌকাডুবি হয়ে যায়। আমি ঝোলা গাঁঠরী পথের উপর রেখে বাবা এবং মা নর্মদার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালাম। জঙ্গলে ত কোন জন্তু জানোয়ারের ভয় নেই, ভয় কেবল বনের গোলক ধাঁধাকে। যা হবার হবে। হর নর্মদে বলতে বলতে ঢুকে পড়লাম বনের ভিতরে।


আমার খুব ভাল করেই মনে আছে, সেবারে একটা অশ্বত্থ ও পরপর তিনটে শিমূল গাছ অতিক্রম করে একটা বড় বেলগাছ এবং আমলকী গাছের আড়ালে কালচে রং এর প্রাচীন মন্দিরটি চোখে পড়েছিল। আমি বনের মধ্যে বেল ও শিমূল গাছের চূড়া লক্ষ্য করে নানারকম লতাপাতা ঠেলে ঠেলে হাঁটতে লাগলাম। কোথাও কোন পথের চিহ্ন খুঁজে পাচ্ছি না। মিনিট পনেরো হাঁটার পর একটা শিমূল গাছের চূড়া দেখতে পেয়ে সেইদিকে দৃষ্টি রেখে হাঁটতে লাগলাম। কাছাকাছি এসে দেখি প্রায় ১০ ফুট ব্যাস যুক্ত গুঁড়িওয়ালা শিমূলগাছ। তার পিছনে অসংখ্য বনপাদপ, নটরাজের মত তাণ্ডব নৃত্যের ভঙ্গীতে শাখা বাহু ছড়িয়ে বনের শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে। শোভা দেখার মন এখন নেই। নিরাশ হলাম! কারণ ভূতনাথের মন্দিরের কাছে এত বড় গাছ ছিল না। সেখানে আছে পরপর তিনটি শিমূল গাছ, বেলগাছ ও আমলকী গাছ। যা এখানে ধারে কাছে দেখছি না।


সে পথ ছেড়ে জঙ্গলের অন্য পথ ধরলাম। শিশিরসিক্ত নিস্তদ্ধ বনস্থলীতে কত রকমের বন্য বিহঙ্গের অদ্ভুত সব কূজন শুনতে পাচ্ছি। একটা পথের চিহ্ন দেখতে পেয়ে আশায় বুক দুলে উঠল। এই পথ নিশ্চয়ই ভূতনাথের মন্দিরে পৌঁচেছে। সেই পথের নিশানা ধরে হাঁটতে লাগলাম। হায় ভগবান, এ যে পৌঁছে গেলাম এমন এক জায়গায় যেখানে অনেকখানি অনাবৃত পাথর বেরিয়ে আছে। পাথরের পাশ দিয়ে হেঁটে মিনিট দশেক পরে পৌঁছলাম বনের এমন একপ্রান্তে যেখানে বন ঢালু হয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে, সেখানে এখনও কুয়াশা জড়িয়ে আছে গাছপালায়। মনে হচ্ছে ঢালুতে নিচে কেউ বুঝি আগুন দিয়েছে, তার ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠে আসছে জঙ্গলের ভিতরে। এইভাবে এদিকে ওদিকে ঘুরপাক খেতে খেতে অবশেষে হতাশ হয়ে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসে পড়লাম গাঁঠরীর উপর।


বড় বড় গাছপালার ফাঁক দিয়ে তির্যকভাবে রোদ এসে পড়েছে গায়ে। আমি হতাশ মনে মা নর্মদার ষড়ক্ষরী মূলবীজ জপ করতে লাগলাম। মিনিট পাঁচেক পরে বনের ভিতরে কোথাও থেকে কানে একটা গান ভেসে এল। কান পাততেই ধীরে ধীরে বুঝতেও পারলাম সেই গানের ভাষা ---



মেরে আখন কে দৌতারে,
পিতা-পুত্রী অভিরাম মনোহর
কৈলাস-কণ্টক মেঁ বাঢ়ে

আমি লাফ দিয়ে উঠে পড়লাম। এ যে ভারোচের সেই 'কঙ্কালসার ভক্ষণাসুর' সাধুর কণ্ঠস্বর! আনন্দে মন নেচে উঠল। গানের সুর লক্ষ্য করে গাছপালা মাড়িয়ে হাঁটতে লাগলাম।

শুক শারদ নারদ বলিহারী
মহিমা বর্ণত হারে।
মেরে আখন কে দৌতারে।

গানের ভাষা ও সুর ক্রমশঃ স্পষ্টতর ও নিকটতর হচ্ছে ---

মেরে আখন কে দৌতারে,
রেবা শিবম্‌, শিবম্‌ রেবা
ইয়ে দৌ, রূপ উজারে।

একটা লতার  ঝোপ অতিক্রম করতেই পরপর তিনটি শিমূল গাছ, বেল ও আমলকী গাছের আড়ালে ভূতনাথের মন্দির চোখে পড়ল। দরজার চৌকাঠে বসে আছেন গায়ক। কিন্তু ইনি ত ভারভূতি বা ভারোচের সেই 'ভক্ষণাসুর' সাধু নন। ইনি যে আমার পরম প্রিয় যোগিরাজাধিরাজ প্রলয়দাসজী! আমার হাত থেকে গাঁঠরী, ঝোলা, লাঠি ইত্যাদি খসে পড়ল। মাথা ঘুরে গেল, আমি ধপ্‌ করে মাটিতে বসে পড়লাম। মিনিটখানিক তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার বিস্ময়ের ঘোর কিছুতেই কাটছে না, ভাবছি ইনিই কি তিনি অর্থাৎ যাঁর একসঙ্গে প্রায় ৮০টা কলা এবং ৮টা নারকেল খাওয়া দেখে রতনভারতীজী যাঁকে 'ভক্ষণাসুর সাধু' বলে অভিহিত করেছিলেন। তাকাবার সময় উভয়েরই চোখ দুটির অদ্ভুত ধরণের মিজিমিজি ভঙ্গিমা ছাড়া আর কিছু দৈহিক সাদৃশ্য ত চোখে পড়ছে না! 

'আমার কাছে উঠে এসে ভূতনাথকে প্রণাম কর। ভৃগুকচ্ছ ত পরিক্রমা করে এলে তাতে আমি খুব খুশী হয়েছি, তবে কিছু অসন্তোষের কারণ ঘটেছে। মূল শ্রীপতি তীর্থে এবং ভূতেশ্বরের শাম্ভবী পীঠে বিশেষতঃ ফেরার সময় ভারভূতেশ্বরের মহাদেবকে মহর্ষি তণ্ডিকৃত মহাস্তবরাজ শুনিয়ে আসা উচিত ছিল। যাই হোক, এখন মধ্যাহ্ন আসন্ন। মধ্যাহ্নক্ষণ ধরে তোমাকে ভূতনাথের পূজা করতে হবে। মন্দিরের মধ্যে ফুল, বেলপাতা, চন্দন সবই আছে। তুমি পূজা করতে বসে যাও। আমি মহাদেবের জন্য কিছু ভোগ সংগ্রহ করে আনছি।' 


এই বলে তিনি লাঠি হাতে নিয়ে কোথাও যাবার উপক্রম করতেই আমি তাঁর পায়ে লুটিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলাম। 'শিবং ভূয়াৎ' বলে তিনি লাঠি ঠুকে ঠুকে মন্দিরের পিছন দিকে চলে গেলেন। আমি দু'তিন মিনিট হতভম্ব হয়ে বসে থাকলাম।




To be continued...................







Wednesday, August 6, 2014

বেদ কি ------


বেদ হল সাক্ষাৎ ব্রহ্মবাণী। বেদ অনন্ত ঞ্জানের আকর, ভারতীয় সংস্কৃতির মণি-মঞ্জুষা।



শ্রমেণ তপসা সৃষ্টা ব্রহ্মণা বিত্তর্ত্তে শ্রিতা।। ১
সত্যেনাবৃতা শ্রিয়া প্রাবৃতা যশসা পরিবৃতা।। ২
স্বধয়া পরিহিতা শ্রদ্ধয়া পর্যূঢ়া দীক্ষয়া গুপ্তা যঞ্জে প্রতিষ্ঠিতা লোকো নিধনম্‌।। ৩


---- শ্রম ও তপস্যায় ব্রহ্মবাণী সৃষ্ট হয়। ভক্তি ও ঞ্জানে তাকে প্রাপ্ত হওয়া যায়। সেই সুগভীর সত্য ঋতে আশ্রিত। সত্যই তার আবরণ, সত্য তার বিজয়শ্রী, কল্যাণে তা পরাবৃত এবং যশে তা পরিবৃত।

বেদের অপর নাম শ্রুতি। বেদই মানুষকে শুনিয়েছেন যে, সে ক্ষুদ্র নয়। তার মধ্যেই রয়েছে পরিপূর্ণতার স্বধা। শ্রদ্ধা, শুচিতা, তপস্যা এ ব্রত পালনের দ্বারাই তা বিকাশ প্রাপ্ত হয়। বেদের দীক্ষা-বীর্যই জীবকে অমৃত তত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত করে, অন্তরস্থ যঞ্জশিখা দ্বারা তার এই অমৃত সত্ত্বার বোধন ঘটে। সে তখন বুঝতে পারে যে, সে সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়, সমগ্র ত্রিলোকই তার নিবাসস্থল --- সে মহতো মহীয়ান সর্বব্যাপ্ত সত্তা। যে অমৃতবিদ্যা মানুষের জীবনকে প্রদীপ্ত করে, পরিতৃপ্ত করে, প্রসন্ন করে এই বিদ্যার রহস্য অবগত হতে হলে চাই অবিচল শ্রদ্ধা, শুদ্ধা, বোধি, অবিশ্রান্ত যত্ন ও অবিরাম তপস্যা।



https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191

Monday, July 28, 2014


"................ বেদ-বেদান্ত  অধ্যায়নকালে তিনি প্রায়ই বলতেন অদ্বৈতবেদান্তের নিগূঢ় রহস্য বুঝতে হলে বিদ্যারণ্য মুণীশ্বর প্রণীত পঞ্চদশী অপরিহার্য। বিদ্যারণ্য মুণীশ্বর সনাতন ব্রহ্ম সংবিদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন --- এই সংবিদের উদয় নেই, অস্তও নেই, এটি স্বপ্রকাশ এবং স্বতঃপ্রমাণ।

পঞ্চদশী ধৃত ঐ সংবিদ যেমন নিয়ত পরিবর্তনশীল জগতে নিত্য  এবং শ্বাশত, তেমনি মদীয় পিতৃদেব প্রদত্ত পঞ্চদশ  উপদেশও শুধু আমার (লেখকের) জীবনে কেন, যে কোন মানুষের জীবনে শাশ্বত আলোক বর্তিকার মত; জীবনে যত পরিবর্তনই আসুক, তাঁর উপদেশের অন্তর্নিহিত সংবিদই যে কোন মানুষের জীবনের ধ্রুব পথটিকে উদ্ভাসিত করে তুলবে। উপদেশগুলি হল ---


1. সব সময় লেখাপড়া করবে। বই এর পর বই, লাইব্রেরীর পর লাইব্রেরী উজাড় করে পড়বে। হাতের কাছে পঞ্জিকা জুটলে তাই পড়বে। তাতেও অনেক শিক্ষণীয় বিষয় থাকে। প্রত্যেকের কিছু না কিছু নেশা থাকে। বই পড়া-ই তোমার নেশা হোক।


2. যা কিছু পড়বে, শুনবে এবং দেখবে তা বিচার পূর্বক গ্রহণ করো।


3. প্রীতির ঘাটে অপরাধ করো না। যে তোমাকে ভালবাসে, তার ত্রুটি বিচ্যুতি উপেক্ষা করতে শিক্ষা কর।


4.
যে তোমাকে দেয় জল, প্রতিদানে অন্ন দিও তারে,
মিষ্ট কথা বলে যদি কেহ, নমস্কার করো বারে বারে।
কড়ি যদি পাও কভু মোহরেতে দিও প্রতিদান,
প্রাণ যে বাঁচাল তব তার তরে দিও তব প্রাণ।
একগুণ পাও যদি তুমি দশগুণ দিও তারে ফিরে,
অপকার পাও যদি কভু, উপকারে রেখো তারে ঘিরে।।

5. সংস্কৃত শাস্ত্রের সেবায় জীবনপাত করবে। সংস্কৃত একাধারে ঞ্জান এবং আনন্দের খনি। "ধন্যা সংস্কৃতবাক্‌ সুধাপরতরা গীর্ব্বাণসংসেবিতা।"

'ধন্য সংস্কৃতভাষা! কি রস তোমার,
সুধাও তাহার কাছে অতি তুচ্ছ ছার।'

6.  বৈদিক  ঋষিদের কেউ অমর্যাদা করলে তা পিতৃ-অপমানের সমতুল্য মনে করবে এবং তার প্রতিবিধানে তৎক্ষণাৎ তৎপর হবে। স্বদেশী, বিদেশী যিনি যত বড় পণ্ডিতই হোক না কেন, তাঁরা যদি কেউ ঋষি বাক্যের বিকৃত অর্থ করেন, তা নির্ভয়ে খণ্ডন করা কর্তব্য। তোপের মুখে উড়িয়ে দিলেও সত্য প্রকাশে কখনও কুণ্ঠিত হবে না।


7.  প্রিয় বা অপ্রিয় কিছু উপস্থিত হলে তাকে আদরে গ্রহণ করতে হয়। তা চলে যাবার উপক্রম করলে নিবারণ করতে নেই। সুখ, দুঃখ অভাব অনটনকে শান্ত চিত্তে গ্রহণ করতে অভ্যাস কর। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জীবনের ভিত্‌ পাকাপোক্ত হয়। মহাত্মা যীশুখ্রীষ্টের জন্ম আস্তাবলে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম কংসের বন্দীশালায়। মা জানকী, কুন্তীদেবী এবং পঞ্চ পাণ্ডবকে অনেক লাঞ্ছনা ভোগ এবং অনেক কান্না কাঁদতে হয়েছে। এইসবের তাৎপর্য কখনও ভেবে দেখেছ কি? কেবল তোতা পাখীর মত শাস্ত্র মুখস্থ করলেই চলবে না। প্রত্যেকটি ঘটনাও চরিত্র অঙ্কনের মূলে ঋষিদের উদ্দেশ্য কি, তা হৃদয়ঙ্গম করতে চেষ্টা কর। এটাই সর্বোত্তম তপস্যা কেননা জীবন্মুক্তি লক্ষণ-স্থিতি রূপী তপস্যা।


8.  ঈশ্বর আছেন --- এটাই ধ্রুব সত্য।


9.  ভয়, ভাবনা, ভূত, ভোগ ও ভগ --- এই পাঁচটি 'ভ'- কারান্ত শব্দের উপদ্রব থাকলে ভগবানকে লাভ করা যায় না। যেমন --- অন্ধকার থাকলে  আলোর অভাব  এবং  আলো থাকলে অন্ধকারের অভাব সূচিত করে, তেমনি উক্ত পাঁচটি 'ভ'- কারান্ত শব্দের সঙ্গে  ষষ্ঠ 'ভ'- কারান্ত শব্দ ভগবৎ -তত্ত্বের নিত্য বিরোধ বর্তমান।


10.  মন  চঞ্চল কারণ সে অখণ্ড আনন্দের প্রত্যাশী। সে অখণ্ড আনন্দের স্বাদ জানে, অথচ পাচ্ছে না। ফলে, বিষয় হতে বিষয়ান্তরে ছোটাছুটি করে। চঞ্চলতা মনের স্বভাব নয়, স্থৈর্যই তার স্বভাব। চাঞ্চল্যটা তার সাময়িক ব্যারাম মাত্র।


11.  একটা  দেশলাই কাঠি যদি সারা বৎসর ধরে অহরহ উল্টো দিকে ঘর্ষণ করা  হয়, তাতে যেমন আলো জ্বলে না, ঠিক তেমনি প্রক্রিয়ামত ধ্যান না করলে কিছুতে ফল পাবে না। প্রক্রিয়ামত এবং অনুরাগ সহকারে ধ্যান করে যাও, আনন্দের সন্ধান অবশ্যই মিলবে।


12.  ভগবানের নিকট কখনও কোন মানৎ --- মানসিক করবে না। ভগবান কারো বাজার- সরকার নন যে, প্রাতঃকালে শয্যা ত্যাগের পর হতে রাত্রিতে পুনরায় শয্যা গ্রহণ পর্যন্ত কেবলই 'এটা দাও ওটা আন' বলে ফর্দের পর ফর্দ পেশ করব আর তিনি তটস্থ হয়ে তদ্দণ্ডে তা করে দেবেন।


13.  অসন্তুষ্টাঃ দ্বিজাঃ নষ্টাঃ। অতএব সর্বাবস্থায় চিত্তের সন্তোষ বজায় রেখে চলবে --- সন্তোষং পরমং ধনম্‌।


14.  জীবনের আদর্শ কি তা জানতে হলে নিজের গোত্রকে ভাল করে জানতে হবে। প্রত্যেকের গোত্রের মধ্যেই নির্দেশ আছে। আমাদের বাৎস্য গোত্র। বাৎস্য গোত্রের প্রবর অর্থাৎ প্রকৃষ্টরূপে বরণীয় ঋষি যথাক্রমে --- ঔর্ব্ব, চ্যবন, ভার্গব, জামদগ্ন্য এবং আপ্লুবান্‌।


a) ঋষি ঔর্ব্ব  ছিলেন  সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর, সগরের গুরু। তিনিই পৃথিবীতে অগ্নি তত্ত্বের প্রথম উদ্ভাবক; তিনিই বলেছিলেন, 'জীবন তো কেবল জৈব কর্ম নহে --- ইহা বিশ্বদেবের পূজা। সমগ্র মানব জীবনকে বৈশ্বানরের  অগ্নিচয়ন-যঞ্জ বলে মনে করবে।' তাঁর জীবন এই শিক্ষা দিচ্ছে যে --- তত্ত্বঞ্জানের সঙ্গে বিঞ্জান চেতনাও প্রয়োজন।

b)  চ্যবন মুনি অতিরিক্ত ভোগের ফলে অকালে জরাগ্রস্ত হন, পরে সংযম ও সাধনা দ্বারা জরা ব্যাধি জয় করেন। মাত্রাতিরিক্ত ভোগের কুফল এবং তা জয়ের কৌশল এই মুনির জীবন হতে শিক্ষনীয়।

c)  ভার্গব অর্থাৎ শুক্রাচার্য  ছিলেন মৃত-সঞ্জিবনী বিদ্যার কুশলী  আচার্য --- মৃত্যুর উপর জীবনের জয়গানের উদ্‌গাতা।

d)  জামদগ্ন্য (পরশুরাম) ছিলেন তেজ, বীর্য, তপস্যার জ্বলন্ত বিগ্রহ।

e)  আপ্লুবান্‌  ছিলেন দেশ প্রেমিক ঋষি, তিনি মাতৃভূমিকে জড় মাটি, কাঠ পাথরের ভূখণ্ড বলে ভাবতেন না --- তাঁহার ভাবদৃষ্টিতে মাতৃভূমি ছিল মৃন্ময়ী মা।

আমাদের গোত্র-পুরুষ এই সমস্ত ঋষির জীবনাদর্শ মনন করলেই পথের সন্ধান পাবে।

15.  যা কিছু দুর্গম, দুস্তর, দুর্লভ এবং দুঃসাধ্য --- "তৎ সর্বং তপসা সাধ্যং তপো হি দুরতিক্রমম্‌।" তপস্যা দ্বারাই সব কিছু লাভ করা যায়। পরশুরাম  রামচন্দ্রকে বলেছিলেন, তুমি শরনিক্ষেপ করে আমার স্বর্গপথ রুদ্ধ করতে পার, তুমি কেবল আমার তপস্যার পথ নষ্ট কোরো না। কারণ, তপস্যার পথ  খোলা থাকলে আমি তপস্যা দ্বারা সব কিছুই পুনরায় জয় করে নেব। সারকথা --- তপস্যা।  

তপস্যাই ব্রাহ্মণের একমাত্র ধন। মনে রাখবে --- ব্রহ্মবিদ্যা অনায়াস লভ্য নয়, তার জন্য চাই অবিশ্রান্ত যত্ন, চাই অবিরাম তপস্যা।।" 

https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191



Friday, June 27, 2014


"তুমি আছ অনলে অনিলে চির নভোনীলে
ভূধরে সলিলে গগণে
আছ বিটপী লতায় জলদের গায়
শশী তারকায় তপনে।"

Tuesday, June 24, 2014


"অসীম আকাশ তোমারে মা জানায় নমস্কার।
বিপুলা ধরণী তোমার চরণে রাখিল প্রণতি তার।
দেবতা মানব সবার অর্ঘ্য সকলেরই বলিদান
মা, তোমার চরণে সঁপি যে একমন একপ্রাণ।।"




"পিতৃজ্যোতি সূর্য সম অপার অনন্ত
মাতৃস্নেহ সমুদ্রসে নাহি তার অন্ত।
পৃথিবীর চেয়ে বড় পিতা জ্যোতিষ্মান্‌
জননীর মাত্রা কেহ জানে না ধীমান্‌!