Sunday, May 11, 2014

মহর্ষি গালব:------


Cont(2).........

দীর্ঘকাল পরে প্রাণাধিক প্রিয় শিষ্যকে প্রত্যাগত দেখেও স্নেহময় ঋষি কোন স্বস্তিবচন উচ্চারণ করলেন না। বরং তিনি বেদনাহত কণ্ঠে বললেন --- গালব তোমার পাতিত্য দোষ ঘটেছে। 
বিভূতির প্রকাশ দেখিয়ে তুমি সাধনার ব্যাভিচার ঘটিয়েছ। বৈদিক ভারতবর্ষের এটি চিরাচরিত বৃত্ত নয়। অত্যন্ত নিম্ন কোটীর যোগীরাই অস্মিতা ও অবস্পন্দনের দোষে আচ্ছন্ন বলেই তাদেরকে ঘিরে অলৌকিক শক্তির প্রকাশ ঘটে যায়। বিভূতি আত্মজ্যোতির অবস্পন্দন বা কুফল মাত্র। 

বৎস, ঞ্জানসিদ্ধিই ঋষিদের আরাধনার বস্তু। যে অমৃতবিদ্যা মানুষের জীবনকে প্রদীপ্ত করে, পরিতৃপ্ত করে এবং প্রসন্ন করে --- সেই বিদ্যাই ঞ্জানসিদ্ধির পথ। তা কোন অলৌকিক শক্তির যাদুক্রীড়া নয়, লোমচমৎকারী ইন্দ্রজাল প্রদর্শন করাও নয়। এই অমৃতবিদ্যা কখনও অনায়াস লভ্য নয়, তারজন্য চাই অবিশ্রান্ত যত্ন, চাই অবিরাম তপস্যা। শ্রম ও তপস্যায় সেই ব্রহ্মবাণী সৃষ্ট হয়। ভক্তি ও ঞ্জানে তাকে প্রাপ্ত হওয়া যায়। সেই সুগভীর সত্য ঋতে আশ্রিত, সত্য তার আবরণ, সত্য তার বিজয়শ্রী, কল্যাণে তা প্রাকৃত, যশে তা পরিবৃত। দিব্যশক্তিকে সংগোপনে অবলীলাক্রমে ধারণ করে আত্মসাৎ করার মধ্যেই কৃতকৃত্যা। যাও অযথা লোক সংগ্রহ বা বৃথা পরিব্রাজন ত্যাগ করে নির্জনে গভীর তপস্যায় নিমগ্ন হও। বেদঞ্জান আহরণ করার তপস্যাতেই জীবনে আসে অভ্যুদয়। আসে উদয়ণ।

নতমস্তকে গুরুর আদেশ শিরোধার্য করে গালব চলে গেলেন তপস্যার জন্য। এক নির্জন গিরিগুহায় ধ্যানাসনে বসলেন তিনি। দিন যায়, বর্ষ যায়, অবিচলিত নিষ্ঠায় ধ্যানমগ্ন রইলেন গালব। বৎসরের পর বৎসর উৎক্রান্ত হয়ে গেল। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষার উপদ্রব, তুষারের প্রবল বিড়ম্বনাও তিনি হাসি মুখে সইতে লাগলেন। 


অবশেষে সেই পরম বাঞ্ছিত দিনটি তাঁর জীবনে দেখা গেল। তিনি দেখলেন --- সমগ্র হিরন্ময় আকাশ, ভর্গজ্যোতির চকিত চমকে ভাস্বর হয়ে উঠলো, তাঁর অন্তরসত্তা ও বহির্সত্তা দ্যুলোক ভূলোক ব্যপ্ত করে প্রকট হয়ে উঠল বেদবাণী ---


"জ্যোতির পুত্র আমরা --- উদ্বোধন আমাদের, অভ্যুদয় আমাদের --- আমাদের জন্যই পরমাস্থিতি আনন্দচকিত ভূমি, বিদ্বেষ এবং দ্রোহ যেন পরাজয় লাভ করে। এই কথা বলেছেন অগ্নি --- যার দিব্যজ্যোতি জীবনকে ভাস্বর করে তোলে। এই কথা বলেছেন সোম --- যার আনন্দপ্রবাহ বিচিত্র এবং মুক্তছন্দ। আমরা পেয়েছি অমৃতলোকের স্বরূপজ্যোতিঃ --- পেয়েছি পরাসংবিদের পরমাদ্যুতি। যাঁর তেজের দিব্যরাগিনীতে দ্যুলোক অনুপ্রাণিত এবং উজ্জীবিত --- সেই আদিত্যের পরম জ্যোতিস্বরূপকে আমরা জেনেছি --- আমরা পেয়েছি আলোর অমৃতভাণ্ডার।

আহারে! এত আলো এত জ্যোতি এত অমৃতের মধুচ্ছন্দরূপ, সে যে প্রতি জীবের চিদ্‌গুহাতেই সংগুপ্ত আছে। জীব! ওঠ, ওঠ, জাগো জাগো, এই পরাকণ্ঠীর জন্য এই দিব্য প্রৈতির জন্যই যে তোমার মনুষ্যদেহে অবতরণ। জীবনটা তো তোমার যঞ্জ ছাড়া কিছু নয়। এই যঞ্জ বসুমান, জীবনের হবি দিয়ে এই যঞ্জকে পূর্ণ কর।

তোমার উর্ধরতি রসান্বিত হোক। যে জীবন উৎসৃজিত, যে জীবন ঊর্ধের অভিসারে আকুল, সেই জীবনেই জেগে উঠে সচ্চিদানন্দের চিদ্‌বিলাস। সংসার অভিযানে ক্লান্ত আমরা। আমাদের চাই এই পরমানন্দের পরিস্ফূরণ। দুঃখের অরণি মন্থন করে আমরা জ্বালাতে চাই ক্রতুময় বহ্নিশিখা। আমাদের জীবনের তপস্যায় জেগে উঠুক আনন্দ সমুদ্রের কল -কল্লোল। জীবনের পরমা হ্রী ও শ্রী এই পথে ওঁ বসুমান ভূয়ামং বসুময়ি ধৈহি।"

ব্যুত্থানের পর গালব দেখলেন ঋষি বিশ্বামিত্র তাঁর সম্মুখে দণ্ডায়মান রয়েছেন। গুরু আনন্দে আত্মহারা। বুকে জড়িয়ে ধরে বারবার আলিঙ্গন করে গালবকে পরিয়ে দিলেন অক্ষমালা। 


গদগদ কণ্ঠে তিনি বললেন --- গালব, আজ থেকে তুমি মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিকুলে স্থান পেলে। তোমার নিকট প্রকটিত বেদমন্ত্র জ্যোতির অক্ষরে লেখা থাকবে মানুষের পরম ঊর্ধায়ণের কথা। আলোর পিপাসা আর তার পরিতৃপ্তি এবং অমৃতের পথে তার উত্তরণের পরমা আশ্বাস বিধৃত হয়ে উঠল এই বাণীতে। দেখ পরমেষ্ঠী গুরুকুল ঋষিকুল বদ্ধ করে তোমাকে প্রণাম জানাচ্ছে। দক্ষিণা দাও বৎস, দক্ষিণা দাও।


মুগ্ধ, আবিষ্ট, পরম পরিতৃপ্ত, আপ্তকাম গালব নিবেদন করলেন --- আদেশয়! যত্তে মনসি বর্ততে। আপনি যা আদেশ করবেন তাই আমি পালন করব। ......



To be continued..........








Friday, May 9, 2014

মহর্ষি গালব:------


মাত্র ৯ বছর বয়সে গালব এসেছিলেন সমিৎপানি হয়ে ঋষি বিশ্বামিত্রের আশ্রমে। বালক সমাবর্তনের শেষে গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন নি। কারণ গুরুগৃহে থাকাকালে তাঁর পিতামাতা গত হন। সংসারের সকল বন্ধন ছিন্ন হওয়ায় গুরুগৃহে কাল কেটেছে গালবের। ঋষিও প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন এই শিষ্যকে। সর্ববিদ্যায় পারংগম, সেবা-তৎপর গালবের বিশেষ গুণ। বেদের সমগ্র শাখায় তাঁর অনায়াসে বিচরণ ক্ষমতা। অন্তেবাসী মাত্রেই জানেন গালব অসাধারণ বিচারমল্ল।

কিন্তু তাঁর পাণ্ডিত্য এবং অতুলনীয় বিচার ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে ঋষি বিশ্বামিত্রের কাছে  অভিযোগ আসে --- বিচারকালে গালব বয়োবৃদ্ধ এবং ঞ্জানবৃদ্ধদের সম্মান রাখেন না।


প্রিয় শিষ্যের নামে অভিযোগ শুনে জ্বলন্ত পাবকের মত মৃগচর্মে সমাসীন গায়েত্রীর মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি গুরু বিশ্বামিত্রের  মুখাবয়বে দেখা দিল ভ্রূকুটিরেখা। সমগ্র ব্রহ্মবর্তে তাঁর আসন বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। অসংখ্য  তাপস, ঋষি বালক, ঋত্বিক, অধ্বর্যু তাঁকে ঘিরে রয়েছেন। পবিত্র হোম ধূমে চারিদিক সুরভিত। এহেন শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে গুরু বলছেন ------  গালব কবে তুমি তর্ক ও জল্প ছেড়ে মৌন অবলম্বন করবে? কবে তুমি মুনি হবে? বৃত্তেন হি ভবত্যার্থো ন ঞ্জানম ন বিদ্যয়া। গালব মনে রেখো পরিশীলিত আর শ্রদ্ধান্বিত জীবনচর্চা দ্বারাই লোকে আর্য হয়। গালবের সতীর্থদের কাছে এ দৃশ্য কল্পনাতীত। বিনীত কণ্ঠে অথচ সপ্রতিভ ভাবে গালব নিবেদন করলেন --- অধুনৈব, অধুনৈব প্রভো! আপনি আশীর্বাদ করলে এখনই পারি।

সেই থেকে গালব হলেন মৌনব্রতী। কখন কুরু, কখন পাঞ্চাল, কখনও বা পুষ্করের গহন অরণ্যে অবধূতের ন্যায় বিচরণ করতে লাগলেন গালব। এইভাবে প্রব্রজ্যা করতে করতে একদিন গালব রাজা অশ্বপাণির অন্তঃপুরে দৈবাৎ প্রবেশ করেন। কোন দিকে দৃক্‌পাত নেই, আত্মানন্দে তিনি বিভোর। প্রতিহারীরা সঙ্গে সঙ্গে এই নির্লজ্জ অবধূতকে বন্দী করে রাজার সম্মুখে উপস্থিত করল।


ক্রুদ্ধ রাজার আদেশে তখনই তাঁর একখানি হাত কেটে ফেলা হল। এতে গালব কোন ভ্রূক্ষেপ করলেন না। মাটিতে ছিন্ন হস্ত পতিত হল। রক্তের ধারা ঝরে পড়ছে। অথচ আহত ব্যক্তি উদাসীন। মুখে কোন ব্যথা বেদনার বিকার নেই। কোন আর্তনাদ নেই। এই অভাবনীয় দৃশ্য দেখে সপারিষদ রাজা স্তম্ভিত। তিনি বুঝলেন যে এই ব্যক্তি নিশ্চয়ই কোন সিদ্ধ তাপস। তাঁরা সবাই পদতলে পড়ে বারংবার ক্ষমা ভিক্ষা করতে লাগলেন। প্রসন্ন হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল অবধূতের মুখ। তিনি অস্ফুট কণ্ঠে বললেন --- অপিধভৎস্ব। ভীত সন্ত্রস্ত রাজা শশব্যস্তে হাতখানি তুলে নিয়ে যথাস্থানে সংলগ্ন করলেন --- ক্ষত চিহ্ন নিমেষে গেল মিলিয়ে --- হাতটি যথাপূর্বং তথাস্থিতং। গালব তাঁদেরকে আশীর্বাদ করে নিষ্ক্রান্ত হলেন সেখান থেকে।


এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে গালব একদিন গভীর রাত্রিতে এক তপোবনের ব্রীহি যবাদির গোলার কাছে গিয়ে সমাধিস্থ হয়ে পড়েন। আশ্রমের ব্রহ্মচারীরা ভাবলেন এই ব্যক্তি নিশ্চয়ই তস্কর। তারা লগুড় হস্তে গালবকে প্রহার করতে উদ্যত হতেই তিনিও তাদেরকে নিবারণ করার জন্য হাত তুললেন। আশ্চর্যের বিষয় ধ্যানস্থ যোগী এবং আশ্রম রক্ষকদেরকে সারারাত্রি ঐ অবস্থাতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। প্রত্যুষে গালব চলে যাবার পর ঐ নিশ্চল অবস্থা থেকে আশ্রম রক্ষকরা মুক্তি পায়।


জনপদে জনপদে ছড়িয়ে পড়ছে গালবের অত্যাশ্চর্য কাহিনীর কথা। আপামর জনসাধারণ গালবকে দেখলেই শ্রদ্ধায় বিগলিত হয়ে পড়ছে। গালবের কিন্তু কোন দিকে লক্ষ্য নেই। অর্ন্তলক্ষ্য বহিঃদৃষ্টি, সর্বত্র সমদর্শন সদানন্দময় গালব এগিয়ে চলেছেন গুরু দর্শনের তীব্র আকাঙ্খা বুকে নিয়ে। পথে আবার এক বিভ্রাট দেখা দিল।


জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে বয়ে নিয়ে চলেছে কাঠুরিয়াদের দল। তারা গালবকে চেনে না। দলের সর্দার শক্ত সামর্থ গালবকে জোর করে কাষ্ঠভার বহন করতে বাধ্য করল। মহাপুরুষের কিছুতেই আপত্তি নেই --- কোন ক্লেশেই তিনি কাতর নন। কাঠের বিপুল বোঝা মাথায় নিয়ে তিনি হাঁটতে লাগলেন কাঠুরিয়াদের সঙ্গে। দলনেতা মহাখুশী। দুর্বিপাক দেখা দিল একটু পরেই। গন্তব্যস্থলে পৌঁছে কাঠুরিয়াদের স্তূপীকৃত কাঠের রাশির উপর তিনি বোঝাটি ফেলে দেবার পরেই দেখা গেল আশ্চর্য অগ্নিকাণ্ড। সমস্ত কাঠই ভস্মীভূত হয়ে গেল।


ঘটনাটি ঘটল গুরুর আশ্রম থেকে নাতিদূরস্থ অরণ্যের এক উপান্তে। কাজেই সেসব কথা ঋষি বিশ্বামিত্রের কর্ণগোচর হতে বিলম্ব হল না। গালব আশ্রমে পৌঁছে গুরুর চরণে ভূলুণ্ঠিত হলেন। কিন্তু গুরু প্রণাম গ্রহণ করলেন না। ......



To be continued ...........

Tuesday, April 15, 2014


তনু  মন  প্রাণ  ঞ্জান  তন্ময়  হে,
চিন্ময়  তুমি  পিতঃ  চিন্ময়  হে।
আনন্দ  রস  ঘন  নন্দিত  হে,
অন্ধ  জীবনে  চির-বন্দিত  হে।

ভ্রান্তি  বিলুণ্ঠিত  সুপ্তি  মাঝে
শান্ত  সমুজ্জ্বল  দীপ্তি  রাজে।
বরেণ্য  শরেণ্য  হিরণ্য  হে
দৈন্য-এ  ক্রন্দন  ধন্য  যাহে।

তুমি  অনন্য  অনন্য  অনন্য  হে
চিন্ময়  তুমি  পিতঃ  চিন্ময়  হে।।



স্নেহরূপ  রত্ন  যাহা
তার  যিনি  পূর্ণরত্নাকর
বাল্যেতে  পালেন  যত্নে
যাঁর  দুটি  কর;
মূর্ত্তিমতী  ব্রহ্মকৃপা  যিনি
এই  ধরাতলে---
মাতা  নামে  পরিচিতা  দেবী
নমস্কার!  নমস্কার!
তাঁর  পদতলে।



শুভ নববর্ষ  ১৪২১

Friday, April 11, 2014


প্রভু! তোমার  নেই  ত  কোন  নাম
তবুও  করি  প্রণাম।
নামী  অনামী  সবই  তুমি
অসীম  তোমার  দাম।
তোমার  নেই  ত  কোন  রূপ
(তবু) জ্বালাই  প্রাণে  পূজার  ধূপ ---
রূপে  অরূপে  বিরূপে  তুমি
মিলনে  বিরহে  অপরূপ  পরিণাম।
তোমার  নেই  ত  কোন  শেষ
নেই  ত  কোন সুরু
আমার  জনম  মরণ  তোমার  হাতে
তাই  তো  তুমি  গুরু
তোমার  নেই  তো  কোন  কিছু
তবুও  ছুটছি  তোমার  পিছু
তুমি শূণ্য, তুমি পূর্ণ
তোমার  ত  হায়! নেই  ত  কোন  বিরাম।







Monday, February 24, 2014

"শিবভূমি কেদারতীর্থ" ------


Cont (last)..........


সন্ধ্যার প্রাকক্ষণে মন্দাকিনীর পবিত্র ধারায় আচমন করে কেদার দর্শনের জন্য মন্দিরাভিমুখে যাত্রা করলাম। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসে হাড়ে কাঁপুনি ধরে যাচ্ছে। কালো গ্রানাইট প্রস্তর নির্মিত সুশোভন মন্দিরের বাম দিকে হনুমানজী, দক্ষিণে পরশুরাম ও মধ্যস্থলে সম্মুখে বিঘ্ন-বিনাশন গনেশজী। ভিতর ভাগে নাতি-প্রশস্ত অঙ্গন, যা দেখতে অনেকটা নাট মন্দিরের মত। পদ্মখোদিত গর্ভগৃহের ছাদ নাটমন্দিরের বামভাগে লক্ষ্মীনারায়ণ, দক্ষিণে পার্বতী, মধ্যস্থলে নন্দীগণ ও বৃষমূর্তি। এইসব দর্শন করতে করতে তুষারনাথ কেদারেশ্বরের সুবৃহৎ জ্যোতির্লিঙ্গের সম্মুখে উপবিষ্ট হলাম।


পাণ্ডার "ওঁ ত্র্যম্বকং যজমহে" মন্ত্রপাঠের মধ্যে আমি (লেখক) দর্শন করতে লাগলাম সেই হিম-গিরিশীর্ষ-শোভী তুষার প্রচ্ছন্ন কেদার-তীর্থকে, যা সুর-নর-মুনি বন্দিত জটাজূটধারী ত্র্যম্বকের অবিচল ধ্যান মূর্তি! ধ্যান নিমীলিত নেত্রে মহাদেবে পূজার পর বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রণাম জানালাম আমার ঋষি-পিতাকে। যাঁর নির্দেশে আজ আমি এস্থানে উপস্থিত হয়েছি। এই তীর্থ যাত্রায় যেন আমার সকল সাধনা সফল ও সম্পূর্ণ।


পাণ্ডা ঠাকুরের সঙ্গে ধর্মশালায় ফিরে এলাম। আমি তাকে দক্ষিণা দিয়ে বিদায় করতে চাইলাম। কিন্তু পাণ্ডা ঠাকুর আমার ঘরে বসে পড়ে বলতে লাগলেন --- আপনাকে আমার ভালো লেগেছে। তাই যাবার আগে আপনাকে কেদারের এক গুপ্ত রহস্য বলে যাচ্ছি---


উত্তরাখণ্ডে বর্ণিত সুবিশাল কেদার-তীর্থের মাহাত্ম্য সকলেরই দৃষ্টিতে অতুলনীয় হলেও জানবেন বাইরের প্রকৃতিতে যেভাবে মন্দাকিনী, সরস্বতী, মধু-গঙ্গা, দুধ-গঙ্গা বয়ে এসেছে, ভৈরব মূর্তি পাহাড়ে যেভাবে যেস্থানে অবস্থান করছে তারই ক্ষুদ্র প্রতিরূপ হল এই মন্দিরস্থ প্রাণনাথ। বাইরে কেদারের যেমন বিশাল অচঞ্চল রূপ তেমনি ভিতরে তার ক্ষুদ্র সংস্করণ।


তারপর আমাকে বাইরে যাবার ইঙ্গিত করে বললেন --- আসুন, আপনাকে একটা মজার দৃশ্য দেখাই। ঘোর অমাবস্যার রাত্রিতে এই জমে যাওয়া ঠাণ্ডায় বাইরের দিকে ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন  সমগ্র কেদার-খণ্ড যেন কাক-জ্যোৎস্নায় উদ্ভাসিত। মনে হবে পাহাড়ের মাথায় যেন লক্ষ ওয়াটের আলো জ্বালা হয়েছে আর তাতেই যেন সারা অঞ্চল আলোকিত হয়ে আছে। এখন মন্দির বন্ধ। কিন্তু মন্দিরাভ্যন্তরস্থিত প্রাণনাথও এরকম উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময় যা দিনের বেলায় আলোর মধ্যে দেখা যায় না।


লিঙ্গ গাত্রে কান পাতলে শুনবেন শঙ্খ-নিনাদ যা বাইরের নদীগুলির রবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। 'জয় কেদারনাথের জয়' বলতে বলতে তিনি আর এক মুহুর্তও থামলেন না। তাঁর চলে যাবার পর ঘরে এসে দেখি আমার প্রদত্ত দক্ষিণা পড়ে আছে আমার বিছানার পাশে। দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আর পাণ্ডা ঠাকুরের হদিশ পেলাম না।


এই অলৌকিক দৃশ্য দর্শনের পর সারারাত্রি দু'চোখের পাতা এক করতে পারলাম না। সকালে উঠে হিম শীতল ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে মন্দিরে উপস্থিত হলাম। মন্দিরের দরজা সবে খুলেছে। এক বৃদ্ধ পূজারী পূজার আয়োজন করছেন। আমাকে দেখেই বললেন --- আ গিয়া। আমি তাঁর কথার কোন উত্তর না দিয়ে পাণ্ডা ঠাকুরের কথা অনুযায়ী কেদারনাথজীকে নিরীক্ষণ করতে লাগলাম। লিঙ্গগাত্রে কান পাততেই শুনতে পেলাম শত শত মৃদঙ্গের তালে তালে অপূর্ব মধুর বোল। বুঝলাম তাঁর কথা বর্ণে বর্ণে সত্যি!


ঐ পাণ্ডাঠাকুরের অনেক খোঁজ করলেও তাঁর দর্শন মেলে নি। অদ্ভুত অভিঞ্জতাকে সঙ্গে করে, কেদারনাথকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম নিবেদন করে কেদার খণ্ড ত্যাগ করে ফিরে চললাম বাড়ীর পথে।


https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191


Friday, February 21, 2014

"শিবভূমি কেদারতীর্থ" ------


............ বদ্রীনাথ যাত্রার অসীম কষ্ট অগ্রাহ্য করে কেদারের পথে যাত্রা করলাম। জোশীমঠ থেকে বাসে রুদ্রপ্রয়াগে এসে সেখান থেকে চড়াই উৎরাই করতে করতে গুপ্তকাশী, রামপুর হয়ে গৌরীকুণ্ডের পথে যাত্রা করলাম। আমরা নীচের উৎরাই পথে ক্রমশই নেমে চললাম। কিছুদূর অগ্রসর হতে বাম দিক থেকে আসা বাসুকি-গঙ্গার কলকল ধ্বনি শুনতে পেলাম। বাসুকি গঙ্গার ওপারে বিশালকায় ধূম্র পাহাড়। তার পাশ হতে দুধ-গঙ্গা মিশ্রিত মন্দাকিনী শ্বেতধারা প্রচণ্ড নিনাদে বাসুকি-গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

পুল পার হয়ে মন্দাকিনীর ধারে ধারে ক্রমাগত চড়াই পথে উঠে গৌরীকুণ্ডে পৌঁছলাম। এখানে তিনটি কুণ্ড এবং প্রত্যেক কুণ্ডে গোমুখ দিয়ে জলধারা বাইরে বেরিয়ে আসছে। কুণ্ড ছাড়াও তপ্তকুণ্ড আছে, পাশেই গোরক্ষনাথ মহাদেব ও পার্বতীদেবীর মন্দির। তৃতীয় কুণ্ডের নাম বিষ্ণুকুণ্ড। গৌরীকুণ্ডে স্নান করে মহাদেবের পূজা করে এক বৃদ্ধ দোকানদারের অনুরোধে তাঁরই দোকানের উপরের ঘরে আশ্রয় নিলাম।


কোন প্রকারে রাত্রি যাপন করে পরদিন সকালে সাড়ে সাত মাইল দূরস্থ কেদারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। ডানদিকে মন্দাকিনীর নিরন্তর কল-কল শব্দ কানে বেজে চলেছে। প্রথমে জঙ্গল চটী তারপর রামবাড়া চটী অতিক্রম করতেই চোখের সামনে রজত-গিরির শ্বেত সৌন্দর্য ফুটে উঠল।


হিমগিরির এই শুভ্র তুষারাচ্ছাদিত স্থানে যোগিজন-বাঞ্ছিত দেবাদিদেব স্বয়ম্ভূ কেদারনাথ দর্শনের জন্য এক নিমেষে ছুটে যেতে ইচ্ছে হল। কিন্তু এই দুর্গম পথের শেষ কোথায়? লোকালয়হীন দুরধিগম্য পর্বতের চড়াই উৎরাই পথে কোথাও জঙ্গল, কোথাও নদী, কোথাও বা তুষারের চির পিচ্ছিল পথ। বিরাট বিশাল নব নব প্রকৃতি বৈচিত্র্যের মাঝখানে বিচিত্ররূপী লীলাময় মহাদেবের অবস্থান।

দু'তিনটি ঝর্ণা পার হবার পর দেখলাম আমাদের যাত্রাপথের উপর অবিশ্রান্ত বৃষ্টি ধারার মত একটি ঝর্ণা ঝরে পড়ছে। লাঠিতে ভর করে ভিজতে ভিজতে অতি সন্তর্পনে তা পার হলাম। মাঝে মাঝেই চলার পথের ধারে জমে রয়েছে স্তুপীকৃত তুষার-রাশি।

পথ ক্রমশ এঁকে বেঁকে চড়াই পথে উত্তরাভিমুখে অগ্রসর  হয়েছে। যতই অগ্রসর হচ্ছি ততই তুষার-ক্ষেত্রের ব্যপ্তি বেড়ে চলেছে। সমস্ত পাহাড় জুড়ে শুভ্র সুন্দর উজ্জ্বলতা। এখানের নতূনত্ব হল যে এখানকার দক্ষিণভাগের লম্বা পাহাড়টি তুষার-মণ্ডিত তবে তাতে উঁচু-নীচু অগণিত শৃঙ্গদেশ নেই।

কিছুটা হাঁটার পরই দূর হতে যখন সেই আকাশ-চুম্বী, ঝলমল সৌন্দর্য্য- মণ্ডিত সুবিশাল রজতগিরি চিত্র-বিচিত্র রূপে চোখের সম্মুখে হঠাৎ ঝলসিয়ে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে সেই অমল-ধবল সৌন্দর্য্যের মাঝখানে হিমগিরির চির পবিত্র পীঠে গঠন শৈলী, স্বাতন্ত্র্য ও মাধুর্য্যে অনবদ্য কেদারনাথের সুশোভন মন্দির দৃষ্টিগোচর হল।

তখন আনন্দ অধীর চিত্তে সেদিকেই দ্রুত হাঁটতে লাগলাম, মন আনন্দে ভরে উঠল। মনে হল, পৃথিবীর ধূলি-ধূসরিত বাসনা-পঙ্কিল স্থান যেন অতিক্রম করে সেই মুনি-দেব-গন্ধর্ব বাঞ্ছিত স্বর্গের সৌন্দর্য্য-নিকেতনে উপস্থিত হয়েছি। চারদিকে যেন বিরাজ করছে স্বর্গীয় পবিত্রতা ও চিরমধুর শুচিতা।

বেলা দেড়টা নাগাদ দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম কেদার-তীর্থে উপস্থিত হলাম। মন্দিরের চত্বর বেশ উঁচু। মহিষের পৃষ্ঠদেশরূপী পিরামিডধর্মী কেদারনাথ। গোটা গায়ে ঘি-এর প্রলেপ। প্রশান্ত ভাব-গম্ভীর পরিবেশ সারা মন্দিরময়।

মন্দিরকে ঘিরে বহু ধর্মশালা ও যাত্রী-নিবাস দৃষ্টিগোচর হল। এমন সময় একজন আমারই সমবয়সী পাণ্ডা দৌড়ে এসে আমাকে নিয়ে বিকানীর মহারাজার ধর্মশালায় উপস্থিত হল। থাকার ব্যবস্থা ভালই। কিছুক্ষণ পরে সে গরম গরম পুরী, সব্জী ও দুধ নিয়ে হাজির। তার আথিতেয়তায় আমি মুগ্ধ হলাম। খাওয়ার পর আমি পাণ্ডার সঙ্গে কেদার-তীর্থ দর্শনে বের হলাম।

উত্তরদিক হতে মন্দিরের পশ্চিমদিকে মন্দাকিনী কুলুকুলু রবে নীচের দিকে বয়ে চলেছেন। দু'ধারের শুভ্র উজ্জ্বল স্তূপীকৃত বরফ রাশি মন্দাকিনীকে অধিকতর মহিমামণ্ডিত করে তুলেছে। এই অমল-ধবল তুষার-বেষ্টিত মন্দাকিনীকে স্বর্গের ধারা বলেই মনে হচ্ছে। পূর্বদিক হতে আগত সরস্বতী নদী দক্ষিণাভিমুখী হয়ে মন্দাকিনীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পশ্চিমদিকের পাহাড় হতে দুধ-গঙ্গা নেমে এসেছে। পাহাড়ের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে পাহাড়ের শৃঙ্গদেশে এক ভৈরব-মূর্তি বিরাজ করছেন। দুধ-গঙ্গা, মধু-গঙ্গা, স্বর্গদুয়ারী ও সরস্বতীর মিলন ঘটেছে মন্দাকিনীর সলিলে। দেখে মনে হয় কেদার পাহাড় যেন উপবীত ধারণ করেছে।


To be continued......

Tuesday, January 21, 2014

"দেবভূমি বদ্রী" ------


Cont (Last) ......


সকাল ৫ টায় ঘুম ভাঙল। তিনজনে  ঠিক ৬ টার সময় পাণ্ডুকেশ্বর ছেড়ে এগিয়ে চললাম। পৌনে ২ ঘণ্টার মাথায় পড়ল লামব্‌গড়। লামব্‌গড় ছেড়ে যতই যেতে লাগলাম ততই শৈত্যপ্রবাহ বাড়তে লাগল। গ্রীষ্মকাল এসে পড়লেও পাহাড়গুলি বরফের মুকুট পরে আছে। বোধ হয় মার্তণ্ডদেব পৃথিবীর আরো কাছে এলে তারা সসম্মানে তখন তাদের মুকুট খুলবে। লামব্‌গড় থেকে হনুমান চটি চার মাইল। এতটা পথের মধ্যে শুধু এক জায়গায় পাঁচ সাত খানা চালা ঘর ছাড়া কিছুই চোখে পড়ল না। মানুষ, পশু, পক্ষী, কাক পর্যন্ত এখানে বিরল। প্রকৃতি এখানে অপূর্ব সুন্দরী! পথ ক্রমশই ঊর্দ্ধগামী। দৈহিক কষ্ট যতই বাড়তে থাকে, জাগতিক বস্তু চিন্তা যেন ততই উবে যেতে থাকে।


চারদিকেই নয় দশ হাজার ফুট পাহাড়ে বেড়া, চির, কেলু ও ফার্ণ-এর ভিড়। পথের বাঁ দিকে নীচু দিয়ে অতি বেগে বয়ে যাচ্ছে অলকানন্দ। নদীটি প্রাণময়ী, জীবন্ত। আমরা চলেছি উপরে, নদী নীচে। পর্বত যেন ধ্যানমগ্ন ঋষির মত শান্ত, সমাহিত হয়ে আমাদের নিরীক্ষণ করছে। অলকানন্দা কোলাহলময়ী। সে কোথাও পাহাড়ের বুক থেকে লাফিয়ে পড়ছে, কখনও শিলাখণ্ডের তলায় লুকাচ্ছে, আবার কোথাও বা আবর্তের সৃষ্টি করছে। নেচে গেয়ে কলহাস্যে অপ্সরা যেন ধ্যানমগ্ন ঋষির ধ্যান ভাঙাবার চেষ্টা করছে।


গরমের হাওয়া লেগে বেশীর ভাগ বরাঁশ ফুল ঝরে গেলেও, স্থানে স্থানে তাদের সে কি উজ্জ্বল সমারোহ! পাহাড়ের বুকের সবকিছু যখন বরফের চাদরের নীচে ঘুমায় তখন গাঢ় রক্তবর্ণের বরাঁশই শুধু জেগে থাকে। লিচু পাতার মত ছোট এর পাতা। কলকে ফুলের মত উঁচু গাছের বুক ভর্তি টকটকে লালফুল --- বরাঁশ। এই ফুল সর্বরোগহর। বরাঁশ কেবল ফুল নয়, এ হল বদ্রীনারায়ণের বর, প্রসাদ। 


একটা চির গাছের কুঞ্জ পার হলাম। নদী এখন অনেক নীচ দিয়ে যাচ্ছে। তার গর্জন প্রায় শোনা যাচ্ছে না। বন এখানে বেশ ঘন। কোথা থেকে কোনো লুকানো ফুলের একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। সেই গন্ধে শরীরের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে মুছে শরীরকে সতেজ করে তুলছে। সেই ফুলের সৌরভ মহাআনন্দের আর সেই আনন্দলোকের অনুভূতি অবিস্মরণীয়।


জানার মাঝে অজানার প্রভাব, ঞ্জানের সঙ্গে অঞ্জতার মিশ্রণে, অঞ্জতা ও আনন্দের অবকাশ ও স্পর্শেই সৃষ্টি হচ্ছে, সৃষ্টি চলেছে। সেই ঞ্জানাতীত, বোধাতীতকে অপেক্ষা করেই সব ঘুরছে। এই ঘূর্ণনের চক্রটিকে যিনি ধারণ করে আছেন, তিনিই বিষ্ণু, তিনিই বদ্রীনাথ, তিনিই ওই হঠাৎ আসা আনন্দের আসল কারণ, ফুলের গন্ধটা নয়।


মাইল খানিক যাবার পর যতই বদ্রীক্ষেত্রের কাছাকাছি হচ্ছি ততই দৈহিক কষ্ট তীব্রতর হতে লাগল। মনের গতি প্রকৃতিও যেন সুক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম হয়ে উঠল।আমরা নৃত্য-চঞ্চলা অলকানন্দার গা ঘেঁসে যেতে লাগলাম। এবার মনে হল না অলকানন্দা বিঘ্নোৎপাদিকা বরং জলকণাগুলি যেন মাথা তুলে বলছে --- দাঁড়িও না। আমিও দাঁড়াচ্ছি না তুমিও দাঁড়িয়ো না, এগিয়ে চলো  গন্তব্যের দিকে।


বেলা ১১টা নাগাদ হনুমান চটিতে পৌঁছালাম। এটাই এ পথের শেষ চটি। দোকান ও ধর্মশালাগুলিতে লোক নেই বললেই চলে। সঙ্গী ছেলেটি আমার ও সাধুজীর জন্য এক লোটা গরম চা নিয়ে এল। চা খেয়ে প্রাণ জুড়াল। হনুমান চটিতে আধঘণ্টা কাটিয়ে এগোতে লাগলাম।


এখান থেকে রাস্তা আরো ঊর্ধমুখী এবং চড়াই বেশ কষ্টকর। দশ মিনিট হাঁটি আর বিশ্রাম নেই। প্রতি মুহুর্তে মনে হবে আর এগিয়ে কাজ নেই। সমতলের মানুষদের পক্ষে এই চড়াইতে শ্বাসকষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। একটা বাঁক ঘুরতেই এক অভুতপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ল। সমস্ত পথটাই তুষারবৃত তাতে সুর্যের আলো পড়ে এক জায়গায় ইন্দ্রধনুর সৃষ্টি করেছে। এই বরফ ঢাকা পথ কিভাবে পার হব বলে ভয় হলেও কিন্তু তা আমার পথ রোধ করতে পারল না। দিব্যি বরফ মাড়িয়ে এগিয়ে চললাম। দূর থেকে বরফ পিচ্ছিল বলে মন হলেও তার বেশীর ভাগই আলগা বালির মত। মনে এক বিচিত্র অনুভূতির সৃষ্টি হল। পথের ধারে একটা ঝোরায় জল খেয়ে পাথরে বসলাম। দেখলাম পথ আরোও উঁচুর দিকে চলেছে।


সঙ্গী  দু'জনকে জিঞ্জাসা করলাম --- মন্দির আর কিতনা দূর? দুজনেই সমস্বরে বললেন --- নজদিক্‌। মনে মনে উদীপ্ত হয়ে উঠলাম। শরীরের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে হাঁটতে শুরু করলাম। আরো ২ঘণ্টা হেঁটে অর্ধ মূর্ছিত অবস্থায় এক উপলখণ্ডের ধারে পৌঁছাতেই নজদিকের নাগাল পেলাম! বদ্রীনারায়ণজীর মন্দির ও বসতি দৃষ্টিগোচর হল। বাবার আদেশ পূর্ণ করতে পারার আনন্দে আমার শরীর- মন উদ্বেল হয়ে উঠল। এই যাত্রার যে কষ্ট তা মুহুর্তে দূরীভূত হল।


মন্দিরের নীচেই তপ্তকুণ্ড। জল প্রায় ফুটন্ত গরম। অবগাহন স্নানে পথের সকল ক্লান্তি যেন মুহূর্তে জুড়িয়ে গেল। তপ্তকুণ্ডের ধার থেকেই মন্দিরের সিঁড়ি উঠেছে। মন্দিরে প্রবেশ করে মূর্তির পাদদেশে মাথা ছোঁয়ালাম। সাধুজী আমাকে উদ্দেশ্য করে অনর্গল বলে চলেছেন --- ৩১৫৫ মি উচ্চে বিষ্ণুক্ষেত্র বদ্রীনারায়ণ।


এস্থানে দেবী লক্ষ্মী বদরী অর্থাৎ কুল বৃক্ষরূপে ছত্রাকারে ছায়া দেন ধ্যানমগ্ন নারায়ণকে। মন্দিরের সামনে শ্বেত-শুভ্র গাড়োয়াল-রাণী নীলকণ্ঠ পাহাড় (৬৫৯৫ মি)। দু'পাশে নর ও নারায়ণ পর্বত। ৮ম শতকে আচার্য্য শঙ্কর তপ্তকুণ্ডের কাছে গরুড় গুম্ফায় প্রতিষ্ঠা করেন ভগবান বিষ্ণুকে। পরে গাড়োয়াল রাজ বর্তমান মন্দির নির্মাণ করে দেবতাকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৩ শতকে মন্দিরের চূড়াটি সোনায় মুড়ে দেন রাণী অহল্যাবাঈ। ১৮০৩ এর ভুমিকম্পে বিধ্বস্থ মন্দিরের সংস্কার করেন জয়পুরের মহারাজা। জনশ্রুতি হল মূল মন্দিরটি নির্মাণ করেন রাজা পুরুর বা আর ভাস্কর্য স্বয়ং বিশ্বকর্মার।


মন্দিরটি তিনভাগে বিভক্ত --- গর্ভগৃহ, দর্শনমণ্ডপ, ও সভামণ্ডপ। উঁচু বেদীতে মণিমুক্তো ও অলঙ্কারে ভূষিত পদ্মাসনে কষ্টিপাথরের চতুর্ভুজ বিষ্ণু। তাঁর এক হাতে সুদর্শন চক্র, দ্বিতীয় হাতে পাঞ্চজন্য শঙ্খ, তৃতীয় হাতে কৌমদকী গদা, চতুর্থ হাতে পদ্ম, মস্তকে রত্নখচিত মুকুট, শিরোপরি স্বর্ণছাতা। কেয়ুরে কুণ্ডলে কঙ্কণে অপরূপ শোভা। বিষ্ণুর বামে নর ও নারায়ণ, ডানে কুবের। সামনে রূপোর গরুড় করজোড়ে সম্ভাষণরত। পূজারী হলেন রওয়াল নাম্বুদ্রি সম্প্রদায়।


পুজো সেরে মন্দির থেকে বেরোতেই ঝুরঝুর করে জমাট কুয়াশার মত অজস্র বরফের টুকরো আমাদের উপর পড়তে লাগল। মিনিট তিন-চার পরে বরফ পড়া বন্ধ হয়ে গেল।


আমি  সঙ্গী ছেলেটিকে জিঞ্জাসা করলাম --- অলকানন্দার জল কমে। সে জানাল --- গরম এলে অলকানন্দায় যেই জল কমে, অমনি বরফ গলে নদীকে পুরো করে দেয়। এখানের এমনই মজা যে, সব চূড়ায় সব বরফ গলবার আগেই নতুন বরফ আসার সময় হয়ে যায়।


সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে ওঠার আগেই সাধুজীর কুঠিয়াতে আস্তানা গাড়লাম। ঐ তুষারমণ্ডিত সন্ধ্যারাগ রঞ্জিত অলকানন্দার শোভায় কত শান্তি, কত পবিত্রতা। সকাল হতে কুঠিয়া থেকে বেরিয়ে তপ্তকুণ্ডে স্নান করতে গিয়ে দেখি আর একজন সাধু কুণ্ডের জলে হাত-মুখ ধুচ্ছেন।


মিটিমিটি  হেঁসে আমাকে প্রশ্ন করলেন --- দর্শন হুয়া।

উত্তর দিলাম --- হুয়া।
--- ক্যায়া মাঙ্গা।
--- কুছ নেহী।
--- তব কেঁও আয়া?
--- পিতাজীকে আদেশ পালন করনে কে লিয়ে ঔর ভগবানকে বাসস্থান দেখনে কে লিয়ে।
আমার কথায় সাধুর ভাবান্তর হল। চোখ দুটি চকচক করে উঠল।তিনি উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন --- তেরা দর্শন সার্থক হুয়া। সাধুকে প্রণাম করে পুনরায় বদ্রীনাথজীকে দর্শন করে, হিমালয়ের দেবতাকে প্রণাম করে ফিরে চললাম জোশীমঠে।

https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191