Monday, January 20, 2014

"দেবভূমি বদ্রী" ------


............ ১৯৪৭ সালের গ্রীষ্মের ছুটিতে প্রথম বাবা আমায় (লেখকে) হিমালয়ের পাদদেশে হরিদ্বার-হৃষিকেশ-কেদারনাথ-বদ্রীনাথ দর্শনে পাঠিয়েছিলেন। বাবা বলতেন --- এতদ্‌ঞ্চল হল মর্ত্যভূমের স্বর্গ, দেবতার বাস। ফুলে ফুলে ভরা সবুজে ছাওয়া এ যেন স্বর্গের নন্দনকানন! সাধু-সন্তের লীলাভূমি হিমালয়ের হিম সৌন্দর্য, নিবিড় অরণ্যানী, ঝরণার সুমধুর তান তোকে মোহিত করে দেবে।


যথাসময়ে ডুন এক্সপ্রেসে চড়ে শিবালিক পাহাড়ের পাদদেশ হতে ৩০০মি উচুঁতে হরির দ্বার হরিদ্বারে পৌঁছালাম। দেবভূমি হিমালয়ের প্রবেশদ্বার পুরাণের মায়াপুরী হরিদ্বারে (অতীত নাম কপিলাস্থান) অজস্র মন্দির, আশ্রম, পুণ্যতোয়া গঙ্গা এবং জয় জয় গঙ্গা মাতা ধ্বনি ও ভজনের তালে তালে গঙ্গার স্রোতে প্রদীপের ভাসান আমি প্রাণ ভরে উপভোগ করে চতুর্থ দিনে ব্রহ্মকুণ্ডে স্নান করে সমবেত পাণ্ডাদের ঐকতান ও মন্ত্রের স্পষ্ট উচ্চারণে মধুস্রাবী গঙ্গা বন্দনা শুনতে শুনতে উত্তরাখণ্ডের শ্রেষ্ঠ তীর্থ হরিদ্বার ত্যাগ করে যাত্রা করলাম হৃষীকেশের পথে।


হৃষীকেশ হৃষীকেশের প্রিয়-নিকেতন। হরিদ্বার যদি হয় তীর্থস্থান তবে হৃষীকেশ হল তার সাধনস্থান। হরিদ্বার তীর্থ হলেও শহর।হৃষীকেশ হল তপোবন। দিন নেই, রাত্রি নেই অবিশ্রান্ত ভাবে পতিতপাবনীর কলনাদিনীর আহ্বান ধ্বনির মাঝে হিমালয় ধ্যানমগ্ন তাপসের ন্যায় অটল অচঞ্চল। একমাত্র এখানেই গঙ্গা ও হিমালয়ের পূর্ণ মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। আত্মোপলব্ধির শ্রেষ্ঠস্থান এই হিমালয়। হৃষীকেশে একদিন কাটিয়ে লছমনঝোলা হয়ে যাত্রা করলাম বদ্রী নারায়ণের পথে।


পথের বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য অতুলনীয়। বিশাল সুউচ্চ পর্বতের প্রাচীর ঘেরা, নির্জনতার রাজ্য, হিমালয়য়ের অন্ত:পুরে প্রবেশকারীর মন আপনা থেকেই কেন্দ্রীভূত হয়ে আসে এক নির্দিষ্ট চিন্তায়। চিত্তের ভাবনা ও বিক্ষেপ কমে আসে। সংসারের ক্ষুধিত- তৃষিত কোলাহল কঠিন পর্বতাবরণ ভেদ করে এই শান্তিধামে প্রবেশ করতে পারে না। নীচতার ধূলি, হিংসা দ্বেষের জ্বালাময় বায়ুপ্রবাহ এই পবিত্র তীর্থকে কলুষিত করতে পারে নি। বিলাস প্রিয়তা এবং পার্থিব লালসার এখানে সম্পূর্ণ অভাব। এখানে উপস্থিত হলেই বহু প্রাচীন নিষ্কলঙ্ক, মঙ্গল কিরণানুরঞ্জিত শান্ত জীবনের এক সুকোমল পবিত্র স্মৃতি হৃদয়ে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। হিমালয়ের স্পর্শ মানুষের মনে প্রশ্ন ছড়িয়ে দেয়, উত্তরও দেয় জানিয়ে।


খুব ভোরে উঠে বাসে চড়ে রওনা হলাম ব্রহ্মার তপস্যাক্ষেত্র দেবপ্রয়াগের দিকে। মন্দাকিনী ও অলকানন্দার মিলিত সলিলে গোমুখ থেকে আসা ভাগীরথীর মিলন ঘটেছে দেবপ্রয়াগে। গঙ্গা নামের উৎপত্তিও ত্রিধারার মিলনে দেবপ্রয়াগ।


চড়াই পথের দৃশ্য একেবারে নতূন! যতই উপরে উঠছি, ততই দেখছি পুঞ্জীভূত তুষার রাশি যেন জমে জমে সমগ্র পাহাড়কে ঢেকে ফেলেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তুষার- সৌন্দর্য্যের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পেতে লাগল। চতুর্দিকেই শ্বেতশুভ্র তুষার-কিরীট। মাঝে মাঝে কিছু কিছু দেবদারু, পাইন, চীর। 


প্রকৃতির রাজ্যে একি কেবল বিরাট তুষারের সৃষ্টি! এক রাত্রির বৃষ্টিতে কালো পাহাড় ক্রমশই যেন ছায়াবাজীর মত হঠাৎ একদিনে সাদা হয়ে গেছে। উপত্যকার আশপাশ নিম্নদিকে যতদূর চোখ যায়, পাহাড়ের সর্বত্র যেন শুভ্র বস্ত্রে একেবারে ঢাকা। একদিকে তুষারের এই উঁচু নীচু চমৎকার দৃশ্য, অন্যদিকে পুর্বভাগ থেকে উত্তরভাগ পর্যন্ত অভ্রভেদী তুষার শৃঙ্গের দিকে চোখ ফেরালে স্বর্গের সম্পদ-সুষমাই প্রত্যেককে মুগ্ধ করে দিচ্ছে। 


তুষার-সমুদ্র মন্থন করতে করতে বেলা দশটা নাগাদ পৌঁছলাম শ্রীনগরে। বিকালের দিকে পৌঁছলাম অলকানন্দ ও মন্দাকিনীর সঙ্গমস্থল রুদ্রপ্রয়াগে। অপার্থিব অনুভূতিতে মুগ্ধ হল মন! এখান থেকেই একদিকে গেছে বদ্রীনাথের পথ, অন্যদিকে কেদার ক্ষেত্র। 


বেলা যতই শেষ হয়ে আসছে ততই ভীষণ শীত অনুভূত হতে থাকল। সন্ধ্যার মুখেই ঘন মেঘের সঞ্চার করে বর্ষণ শুরু হল। এই অঞ্চলের মজা হল সূর্য যতই পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ে ততই যেন প্রকৃতি-রাণীর মুখ গম্ভীর ও ভার হয়ে ওঠে।


বিরাটকায় পাহাড়গুলি একবারেই তুষারমণ্ডিত থাকায়, রৌদ্রকিরণে সর্বদাই যেন চোখের সামনে হীরকের মত ঝলমল করছে। এরূপ অপরূপ বিচিত্র দৃশ্যের মধ্য দিয়ে উৎরাই-এর পথে বাস চলল। বেলা এগারটা নাগাদ পৌঁছলাম কর্ণপ্রয়াগে। অলকানন্দা ও পিণ্ডারী গঙ্গার মিলনস্থান। 


অলকানন্দার প্রচণ্ড গর্জন ও ঝিঁ ঝিঁর একটানা কলতান শুনতে শুনতে কর্ণপ্রয়াগ অতিক্রম করে পৌঁছালাম নন্দ রাজার যঞ্জস্থল নন্দপ্রয়াগে। বদ্রীক্ষেত্রের শুরু এখান থেকে। এরপর এল চামোলী। তারপর পিপলকোঠী, তারপর একে একে গরুড়-গঙ্গা, পাতাল-গঙ্গা অতিক্রম করে বিকাল তিনটা নাগাদ পৌঁছলাম জোশীমঠে।


বাস থেকে নেমেই জোশীমঠের নৃসিংহ মন্দির দেখতে গেলাম। শীতের ৬ মাস যখন বদ্রীনাথের মন্দিরে বরফে ঢাকা থাকে তখন তাঁর পূজা হয় এই নৃসিংহমূর্তিতে। অক্ষয় তৃতীয়ার সময় বদ্রীনাথের মন্দির খোলে। জোশীমঠ থেকে বদ্রীর রাস্তা অত সহজ নয়। বদ্রীনাথ ১১০০০ ফুট। শেষের সাত মাইল চড়াই ঠেলে উঠতে সমতলের মানুষদের দু'দিন লাগে।


হিমালয়ের বিপুল বিশাল বৈচিত্র্যের আকর্ষণে আমার একা একা পথ চলা শুরু। রাস্তাঘাট চিনি না বলে চিন্তা হল। পথে এক পাহাড়ীর সঙ্গে পরিচয় হল। সে বলল, চিন্তার কোন কারণ নেই। এধারে চোর ডাকাত বলতে কিছু নেই। হাঁটা পথ একটাই। সে কিছুদূর পর্যন্ত আমার সঙ্গে এসে পথ দেখিয়ে দিল। 


জোশীমঠের অনেক নীচুতে, খাদের মত একটা জায়গায় দেখা যাচ্ছে নদী। সেই নদীর গা থেকে একটা সরু পথ উঠে পাশের পাহাড়টার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। পাহাড়ে আড়ালে কি আছে তা দেখার বা জানার উপায় নেই। নিঝুম, নিস্তব্ধ, জনমানবহীন সেই খাদের মধ্যে যে পথের শুরু হল ওই হল বদ্রীধামের পথ। আসল হিমালয়ের স্পর্শ এখান থেকেই শুরু। পাহাড়ী লোকটি ফিরে গেল। 


আমি নামতে লাগলাম, প্রায় একঘণ্টা উতরাই ভাঙ্গার পর নদীর সেই পাড় এল। কিন্তু পাড় বলতে যা বুঝায় তা নেই, আর নদীও একটা নয়। দুই নদীর সঙ্গম হয়েছে। অলকানন্দা ও বিষ্ণুগঙ্গা বা ধবল-গঙ্গার পূত মিলনস্থল বিষ্ণুপ্রয়াগ নাম গ্রহণ করেছে।


বিষ্ণুপ্রয়াগের উপর পুল পার হয়ে পাণ্ডুকেশ্বরের পথ নির্দেশ জানতে চাইলে একজন বলল --- আমার বাড়ী পাণ্ডুকেশ্বর, আমিও পাণ্ডুকেশ্বর যাব। পথে একজন সঙ্গী জুটে গেল। বুঝলাম --- জীবের অসুবিধা হলেই শিব ছুটে আসেন। জোশীমঠ থেকে পাণ্ডুকেশ্বরের দূরত্ব সওয়া আট মাইল। উচ্চতা প্রায় ৩৫০০ ফুট।


ছেলেটি বলল--- সরকারী লোকেরা পাথর ফাটাচ্ছে। মাথায় পাথর পড়ার ভয় আছে। আমাদের সাবধানে দেখেশুনে যেতে হবে। কারণ পায়ে চলার পথটির থেকে দু'তিনশো ফুট উচুঁ দিয়ে মোটর যাবার রাস্তা তৈরী হচ্ছে। রাস্তাটি বদ্রীনাথ পর্যন্ত্য যাবে। দু'বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে। যাত্রীরা হৃষিকেশ হতে বদ্রীনাথ পর্যন্ত সমস্ত পথটা মোটরে যেতে পারেন তার জন্য ও সৈন্য চলাচলের জন্য। শুনলাম বদ্রীনাথ থেকে মাইল পঞ্চাশ দূরেই বসে আছে চীনা সেনা।


ছেলেটি বলল --- মহাভারতে পাবেন, পঞ্চপাণ্ডবগণ অস্ত্র সংবরণ করার অনতিবিলম্বে পীত দস্যুগণ (চীনারা) হানা দেয় ও গোধন হরণ করে। এই চীনা হানাদারদের উৎপাতেই বহু শত বৎসর আগে বদ্রীনাথের পূজারী বদ্রীনাথজীর বিগ্রহ নারদ কুণ্ডের জলে ফেলে দেন। আচার্য্য শঙ্কর যোগবলে মূর্তির অধিষ্ঠান স্থলটি জানতে পারেন এবং মূর্তিটি উদ্ধার করেন।


সন্ধ্যার অন্ধকার নামার আগেই ছেলেটি একটি কাঠের দোতলা বাড়ীতে আমাকে নিয়ে এল। চারদিকে আরও অনেক বাড়ী ও ধর্মশালাগুলি হানাবাড়ীর মত পড়ে আছে। ছেলেটি আমাকে অপেক্ষা করতে বলে উধাও হয়ে গেল। এমন সময় চোখে পড়ল বাড়ীটির রোয়াকের উপর কম্বল গায়ে একজন বসে। কাছে যেতেই লোকটি আমাকে প্রশ্ন করল --- আপ কঁহা যাইয়েগা? 


বললাম --- বদ্রীনাথজী। আপ? সাধুজী কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন --- বাঙালী! বেশ। বদ্রীনারায়ণের দরজা যতদিন খোলা থাকে ততদিন ঐখানেই থাকি। বাকী দিন গুলি নিচে ঘুরে বেড়াই। কিছুক্ষণ পর ছেলেটি চাল, ডাল, আলু, তেল, নুন নিয়ে এসে নৈশভোজনের ব্যবস্থা করল। তিনজনের নৈশ ভোজন সমাধা হল। নানা আলোচনার পর শুয়ে পড়লাম।



To be continued......

Monday, January 6, 2014

"পিতরৌ" হী পরমং তপঃ ---


Cont (Last) ......

তৈত্তিরীয়  আরণ্যকের  "মাতৃদেবো  ভব,  পিতৃদেবো  ভব"  মন্ত্রে ঋষিরা  স্পষ্ট  বলেছেন --- পিতা  মাতাকে  দেবতা  বলে  মানবে, প্রতিদিন  তাঁদের  সেবা  যত্ন  করবে। পিতৃপূজা  বা  মাতৃপূজা সর্বতোভদ্র, সর্বকল্যাণকর। পিতা  বা  মাতা  তুষ্ট  হলে  দেবতা প্রীত হন, ধনে  জনে  সৌভাগ্যে  গোত্র  বর্ধিত  হয়। বংশে  কেউ  দীন  হয় না। কেউ  অসুখী  থাকে  না। পিতৃপূজায়  শান্তি  হয়, মানুষ  যা কামনা  করে  তাই  পায়। আরোগ্য, অশোক, অভয়, সৌভাগ্য --- পিতৃপুরুষের  দুর্লভ  দান।

মহর্ষি পতঞ্জলি বলেছেন ---

"সংস্কার-সাক্ষাৎকরণাৎ পূর্বজাতিঞ্জানম্‌" --- সংস্কার  সাক্ষাৎকার করলে পূর্বজাতিঞ্জানরূপা  বিভূতির  আবির্ভাব  হয়। চিত্ত  ক্ষেত্রে অহরহ যে সকল  বাসনা  ফুটে  উঠেছে  সেগুলির  নাম  সংস্কার। সংস্কার শব্দের  সাধারণ  অর্থ  দাগ  বা  চিহ্ন। এই  সংস্কারগুলির ফলেই মানুষের স্বরূপ  বিস্মৃতি। কোন  সাধকের  চিদাকাশে  গতি  হলে পূর্ব পূর্ব  জন্ম ও  জাতির  সমূহ  সংস্কার  তিনি  দেখতে  পান, সাক্ষাৎ মাত্রই সেই সব সংস্কারের  বন্ধন  হতে  মুক্ত  হন। কিন্তু  এই অবস্থা লাভের জন্য  চাই  দৃঢ়  সংযম  এবং  সুদৃঢ়  ধ্যান-নিষ্ঠা। যা সর্ব সাধারণের পক্ষে সহজসাধ্য  নয়।

বৈদিক  ঋষিরা  বলেছেন --- পিতৃপূজায়  স্মৃতির  জাগরণ  ঘটে। মানুষের  স্মৃতি  চৈতন্যের  একটা  সঞ্চয়-ঘর। সেখানে  ঘুমিয়ে আছে অনেক  কালের  স্মৃতি, অদূর  কালের, দূরবর্তী  কালের, জন্ম-জন্মান্তরের। মানুষের  আত্মঞ্জানলাভের  পথ  সুগম  হয়  জন্ম-জন্মান্তরের  স্মৃতির  জাগরণে। পিতৃগণের  পূজায়  এই  জাগৃতি ঘটে, সহসা  ঘটে  চিদাকাশে  উত্তরণ।

এত  সহজে  এত অব্যর্থ  ফল  প্রাপ্তি  ঘটে  বলে  পিতৃমহিমায়  মুগ্ধ মন্ত্রদ্রষ্টা  ঋষিরা  পিতৃপূজাকে  অগ্রাধিকার  দিয়েছেন। তাঁরা যেকোন দেবপূজা, যাগযঞ্জ, এমন  কি  ব্রহ্মধ্যানে  সমাহিত হওয়ার পূর্বক্ষণেও সর্বাগ্রে  পিতৃপুরুষের  ধ্যানপূজা  করতেন। পিতৃপূজা ছাড়া  বৈদিক ব্রহ্মমার্গের  পথ  উন্মুক্ত  হয়  না, জাগ্রত  হয়  না উত্তর সুষুম্নার পথ।সত্যদর্শনের  জন্য  যে  হিরণ্ময়  পাত্রের  আবরণ উন্মোচনের  কথা ঈশোপনিষদে  বলা  হয়েছে --- সেই  দ্বার অপাবৃত  হয়  পিতৃপূজায়।

স্বয়ং  বেদমূর্তি  ভগবান  বেদব্যাস  মহাভারতে  ভীষ্মের  মুখ  দিয়ে যুধিষ্ঠিরকে  উপদেশ  ছলে  দ্ব্যর্থহীন  ভাষায়  ঘোষণা  করেছেন ---


পিতৃন্‌  পূজ্যাদিতঃ  পশ্চাৎদ্দেবতাস্তর্পয়ন্তি  বৈ।
তস্মাত্তান্‌  সর্বযঞ্জেন  পুরুষঃ  পূজয়েৎ  সদা।।

ঋষিরা  প্রথমে  পিতৃগণের  পূজা  করে  দেবগণের  পূজা  করেন অতএব  মানুষ  সর্বদা  সর্বপ্রযত্নে  সর্বাগ্রে  পিতৃগণের  পূজা  করবে।

পিতরৌ  যঃ  ধ্যায়েৎ  স  চ  পুণ্যদেহী
যতির্ভূপতিব্রহ্মচারী  চ  গেহী।
লভেদ্‌  বাঞ্ছিতার্থং  পদং  ব্রহ্মসংঞ্জং
পিতৃপাদপদ্মে  মনো  যস্য  লগ্নম্‌।।

মাতাপিতা  বা  পিতৃপুরুষদের  যিনি  ধ্যান  পূজা  করেন, তিনি পূণ্যবান। দীনদরিদ্র  সাধারণ  গৃহী  হোন, রাজাই  হোন  কিংবা মুনি ঋষি  ব্রহ্মচারী  যেই  হোন  না   কেন,  পিতৃপাদপদ্মে  তাঁর মন লগ্ন থাকলে  তাঁর  সর্বাভীষ্ট  সিদ্ধ  হয়, এমন কি ব্রহ্মপদও লাভ হয়।


https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191

"পিতরৌ" হী পরমং তপঃ ---


পিতা  জীবন্ত  ঈশ্বর, মাতা  জীবন্ত  ঈশ্বরী, তাঁদের  সেবা  পরিচর্যাই জীবনের  মুখ্য  কর্তব্য, মাতা  বা  পিতার  ধ্যান  জপেই  জীবনের পরম  শ্রেয়োলাভ  হতে  পারে। মাতা  পিতাকে  উপেক্ষা  করে  অন্য কোন  অদৃশ্য  দেবতার  কৃপালাভ  করার  জন্য  যতই  তীব্র  সাধন- ভজন  করা  হোক্‌  না  কেন, তা  ভস্মে  ঘৃতাহুতি  মাত্র।

এ জগতে  কেউ  একটু  বেশী  Father-centric , কেউ  বা  একটু বেশী Mother-centric  অর্থাৎ  কারও  মায়ের  প্রতি  যথোচিত  শ্রদ্ধাভক্তি থাকলেও  বাবার  উপর  টান  বেশী, কারও  বা  পিতার  উপর শ্রদ্ধাভক্তি  থাকলেও  মায়ের  উপর  টান  বেশী  থাকে। এটি স্বাভাবিক এবং  সচরাচর  বহুক্ষেত্রেই  দেখা  যায়। পিতার  চরণে প্রণাম  করলে তা  মাতার  চরণে  পৌঁছায়
, মাতার  চরণে ধূল্যবলুণ্ঠিত হলে  তাও পিতা  গ্রহণ  করেন, পিতা  তৃপ্ত  হন। কারণ, উভয়ে  একই তত্ত্বের  দুই ভিন্ন  ভিন্ন  প্রকাশ  মাত্র। উভয়ে একত্রে শিব-শিবানী --- অর্ধনারীশ্বর।

বেদের  বিধান --- সর্বপ্রথম  পিতৃপূজা। মাতা  বা  পিতৃতত্ত্ব  এমনই মধুরতম  শ্রেষ্ঠ  তত্ত্ব  যে, ক্রান্তদর্শী  বৈদিক  ঋষিরাও  ভক্তি  ও ভাবাবেশে  উচ্ছল  হয়ে, তাঁরা  বিভিন্ন  বেদ  মন্ত্রে  একই  কথা বারবার  বলছেন ----


ওঁ  অগ্নয়ে  কব্য  বাহনায়  স্বাহা।
সোমায়  পিতৃমতে  স্বাহা।।

হে  অগ্নে!  তুমি  কব্য  বহন  করে থাক, অতএব  আমাদের প্রাণপুরুষের  পিতৃগণের  উদ্দেশ্যে  এই  কব্য  তোমার  নিকট সমর্পণ করছি, এই  আহুতি  স্বাহুতি  হোক। হে  সোম, তুমি  পিতৃগণের অধিষ্ঠান, অতএব  তোমার  উদ্দেশ্যে  এই  কব্য  অগ্নিতে  হবন করছি, এই  আহুতি  স্বাহুতি  হোক।

দেবতার  উদ্দেশ্যে  যা  দেওয়া  হয়, তা  হব্য। পিতৃগণের  উদ্দেশ্যে হৃদ্য  ও  উপাদেয়  যা  কিছু  অগ্নিতে  দেওয়া হয়, তার  নাম  কব্য।

দেবতা  ও  পিতৃপুরুষ  অগ্নিমুখেই  গ্রহণ  করেন। মাটির  উপর  কুশ পেতে  পিণ্ডার্পন  প্রভৃতি  পরবর্তী  যুগের  ব্যাপার, পৌরহিত্য- তন্ত্রের অবদান।

ওঁ  আয়ন্তু  নঃ  পিতরঃ  সোম্যাসোহগ্নিষ্বাত্তা
পথিভির্দেবযানৈঃ।।

পিতৃগণ, দেবযানে  আগমন  করুন। অগ্নি  আপনাদের  দেহ  গ্রহণ করেছে  কিন্তু  আত্মা  অবিকৃতই  আছে, অগ্নিমুখে  আমাদের  এই অন্ন গ্রহণ  করুন।

ওঁ  যে  নঃ পিতুঃ পিতরো  যে  পিতামহা  য  আবিবিশুরুর্বন্তরিক্ষম্‌।
য  আক্ষিয়ন্তি  পৃথিবীমুতদ্যাং  তেভ্যঃ  পিতৃভ্যো  নমসা  বিধেম।।

আমাদের  পিতৃগণ  যারা  বৃহদাকাশে  "উরু  অন্তরীক্ষং"  প্রবেশ করেছেন, সহজ  কথায়  দিব্যলোকে  আছেন  অথবা  আকাশ  ও পৃথিবী  আচ্ছাদন (আক্ষিয়ন্তি)  করে  বিরাজিত, সকলের  মঙ্গল  ও তৃপ্তিবিধানের  জন্য  অগ্নিতে  প্রাণের  অর্ঘ্য  নিবেদন  করছি।

ওঁ  যে  নিখাতা  যে  পরীপ্তা  যে  দগ্ধা  যে  চোদ্ধিতাঃ।
সর্বাংস্তানগ্ন  আবহ  পিতৃন  হবিষে  অত্তবে।।

পিতৃগণের  দেহ  প্রোথিত  হোক  বা  যেরূপই  তার  পরিণাম  ঘটুক না কেন, হে  অগ্নে!  তাঁদের  ভোজনের  জন্য (অত্তবে)  অর্থাৎ তৃপ্তির অভিপ্রায়  এই  হবিঃ  হোমের  পদার্থ  বহন  করে  নিয়ে  যাও।

মন্ত্রদ্রষ্টা  বৈদিক  ঋষিগণ  উপলব্ধি  করেছিলেন  যে --- মাতা পিতা ও পিতৃগণের  আশীর্বাদ  মর্ত্যের  অমৃত। মাতা  পিতার  প্রত্যক্ষ সেবা পরিচর্যাকে  পূজা  ও  যঞ্জের   মর্যাদা  দেওয়া  হয়েছে। মাতা পিতা জীবিত  থাকলে  তাঁদের  সেবা  যত্নকে  উপেক্ষা  করে  কেবল অহরহ মাতা  পিতার  সিদ্ধ  বীজ  জপ, ধ্যান  বা  কব্যাহুতিতে কোন কাম্যফল  লাভ  হবে  না।  দুই-ই  করতে  হবে।  তবেই  অমূর্ত্ত পিতৃপুরুষ  তুষ্ট  হবেন।  অবশ্য  যাঁদের  মাতাপিতা  লোকান্তরিত হয়েছেন  তাঁদের  পক্ষে  মাতাপিতার  জপ  ধ্যান  এবং  তাঁদের উদ্দেশ্যে  অগ্নিমুখে  কব্য  দানই  মুক্তির  সরণী।

মহাপ্রভু  বলেছেন ---  কৃষ্ণনামে  চেতোদর্পণমার্জনম্‌  অর্থাৎ চিত্তরূপ দর্পণ  পরিমার্জিত  হয়। বৈদিক  ঋষিরা  সহজতর  পথের সন্ধান দিয়ে বলেছেন --- মাতা  পিতার  সশ্রদ্ধ  সেবা  পরিচর্যায় জীবের  চিত্ত  মল নিত্য  পরিমার্জিত  হয়,  চিত্ত  শুদ্ধি  ঘটে। এইভাবে চিত্তরূপ দর্পণ যার পরিমার্জিত  হয়েছে --- তারই  পিতৃযঞ্জে অধিকার।


To  be  continued......









Wednesday, January 1, 2014

Tuesday, December 24, 2013



কোথা  আছে  রে, দীন  দরদী  সাঁই!
পিতৃদেবের  ধেয়ান  ধরো
খবর  পাবে  ভাই।
চক্ষু  আঁধার  ভুলের  ধোঁকায়
কেশের  আড়ে  পাহাড়  লুকায়
কি  রঙ্গ  সাঁই  দেখছে  সদাই,
বসে  নিগম  ঠাঁই।
অহরহ  দেখছ  তারে
চেনতে  নারো  ভুলের  ঘোরে
পিতার  মাঝে  পরমপিতা
চিনতে  জানা  চাই।।



যা  পাবে  মায়ের  কাছে, তত স্নেহ  কোথা  আছে?

আর  কারও  প্রেমে  তুমি  ভুলিও  না ভাই,
সে  সব  প্রেমের  সরা, সতর্কে  ওজন  করা
    মা'র  প্রেমে  দরদাম  কষাকষি  নাই।



Wednesday, December 11, 2013



জটাটবী-গলজ্জল-প্রবাহ-প্লাবিত-স্থলে, 
গলেহবলম্ব্য লম্বিতাং ভূজঙ্গ-তুঙ্গ-মালিকাম্‌।
ডমড্‌-ডমড্‌-ডমড্‌ ডমন্নিনাদ-বড ডমর্বয়ং, 
চকার চণ্ড তাণ্ডবং তনোতু নঃ শিবঃ শিবম্‌।।



হে প্রভু শিবসুন্দর! তোমার জটার অরণ্য হতে গঙ্গার ধারা গলগল করে বেয়ে এসে তোমার গলদেশকে প্লাবিত করছে, সেই গলদেশ আবার সর্পমালায় বিভূষিত, তুমিই একবার ডমরু বাজিয়ে ডমড্‌ ডমড্‌ ডমড্‌ ধ্বনি তুলে তাণ্ডব-নৃত্যে ত্রিভুবনকে কম্পমান করেছিলে, তুমি আমাদের মঙ্গল বিধান কর।



জটাকটাহসম্ভ্রমভ্রমন্নিলিম্পনির্ঝরী --- 
বিলোলবীচিবল্লরীবিরাজমানমূর্দ্ধনি।
ধগদ্‌  ধগদ্‌  ধগদজ্জ্বল-ললাটপট্টপাবকে
কিশোরচন্দ্রশেখরে রতিঃ প্রতিক্ষণং মম।।



জটারূপ কটাহ হতে বেগে বহমান গঙ্গার চঞ্চল তরঙ্গমালায় যাঁর মস্তক শোভিত এবং যাঁর ললাটে ধগদ্‌ ধগদ্‌ শব্দে অগ্নি দেদীপ্যমান, সেই তুমি কিশোর চন্দ্রশেখর! তোমার চরণ কমলে আমাদের প্রতিক্ষণ রতি হোক।


https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191

Wednesday, December 4, 2013


.......... মহর্ষি রৈক্ক রাজা জানশ্রুতিকে উপদেশ দিতে আরম্ভ করলেন --বায়ুর্বাব সম্বর্গো --- বায়ুই সম্বর্গ। অগ্নি যখন নির্বাপিত হন, তখন বায়ুতেই লীন হন। সূর্য যখন অস্তগমন করেন তখন বায়ুতেই লীন হন, চন্দ্র যখন অস্তমিত হন, তখন বায়ুতেই লীন হন। বায়ুই হচ্ছে মূল সঞ্চালন-শক্তি।প্রলয়কালে তেজোরূপী সূর্যাদি স্বীয় কারণবায়ুতে লীন হন বলে বায়ুকে সম্বর্গ বলে।যখন জল বিশুষ্ক হন, তখন বায়ুতে লীন হন, কারণ বায়ুই বাহ্য-জগতের সব কিছুকে আত্মসাৎ করেন --- বায়ু র্হি এব এতাম্‌ সর্বান্‌ সংবৃঙ্‌ক্তে।


ঋষি এইভাবে দেবতা গণের মধ্যে সম্বর্গ-দর্শনের রহস্য ব্যাখ্যা করে অনন্তর শরীর মধ্যে সম্বর্গ-দর্শনের তত্ত্ব বলতে লাগলেন --- প্রাণই সম্বর্গ। জীব যখন নিদ্রা যায়, তখন বাগিন্দ্রিয় প্রাণে লীন হয়; চক্ষু প্রাণে লীন হয়, শ্রোত্র প্রাণে লীন হয়, মন প্রাণে লীন হয়, কারণ প্রাণই এই সমুদয়কে আত্মসাৎ করে।


এই দুটি তত্ত্বই অর্থাৎ দেবতাদের মধ্যে বায়ু এবং ইন্দ্রিয়গণের মধ্যে প্রাণ --- উভয়েই সম্বর্গগুণশালী --- তৌ বা এতৌ দ্বৌ সম্বর্গৌ বায়ুরেব দেবেষু প্রাণঃ প্রাণেষু।


রাজা জানশ্রুতি রৈক্কমুনির কাছে এই সম্বর্গ বিদ্যা লাভ করে কৃতকৃত্য হলেন। তিনি আত্মঞ্জান লাভ করলেন।



সম্বর্গ শব্দের অর্থ হল ---  সম্যক বর্গ অর্থাৎ সজাতীয় বস্তুকে সম্যকরূপে একশ্রেণীভুক্ত-করণ অর্থাৎ একীকরণ। জীবাত্মা ও পরমাত্মা সজাতীয় বস্তু, যেটুকু ভেদ আছে তা শুধু সজাতীয় ভেদ, একই গাছের বড়পাতা ও ছোটপাতার মধ্যে যে পার্থক্য সেই পার্থক্যকে দর্শনশাস্ত্রের পরিভাষায় সজাতীয় ভেদ বলে। পরমাত্মা ও জীবাত্মা --- একই চিন্ময় বস্তু,পরমাত্মা সর্বব্যাপক, কিন্তু জীবভাবের আবরণ পড়ায় জীবাত্মা দেহের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে। জীব ভাব খসে পড়লে আত্মা পরমাত্মার একীকরণ ঘটে।

সংস্কৃতে সমপূর্বক বৃজ্‌ ধাতুর উত্তর ঘঞ প্রত্যয় করে সম্বর্গ পদ সিদ্ধ হয়।বৃজ ধাতুর অর্থ বর্জন বা ত্যাগ করা। যে অলৌকিক বিদ্যার সাহায্যে জীবাত্মা স্থূলাকাশ ত্যাগ করে সূক্ষ্মাকাশে, সূক্ষ্মাকাশ বর্জন করে কারণজগতে, ক্রমে কারণজগত ত্যাগ করে মহাকারণে লীন হয়, আত্মস্বরূপ প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই সজাতীয় ভেদ রহিত পরমাত্মার সহিত একীকরণ পদ্ধতিই হল এই সম্বর্গবিদ্যা --- ঔপনিষদিক যুগের ঋষিদের অতি প্রিয় গুহ্যতত্ত্ব।



https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191