Wednesday, April 24, 2013

*** নর্মদা পরিক্রমা কি এবং কেনঃ---


ঋষি  সেবিত  দেশ  আমাদের  এই  ভারতবর্ষ। এখানকার  ব্রহ্মর্ষি  মহর্ষিদের  ধ্যানদৃষ্টিতেই  পৃথিবীতে  সর্বপ্রথম ঘোষিত  হয়েছিল  একটি  পরম  তত্ত্ব ------ সর্ব  ঋল্বিদং  ব্রহ্ম ---- অর্থাৎ  যৎ  যৎ  বস্তু  চোখে  পড়ে  তৎ তৎ  বস্তু  ব্রহ্মের  প্রকাশ  বিকাশ। কৃমি  কীট  হতে  স্থাবর  জঙ্গম  যাবতীত  পদার্থ, পশুপাখী  কীটপতঙ্গ  এমনকি  মানুষ, তিনি  পাপিষ্ঠ  বা  পুণ্যাত্মা  যাই  হোক  না  কেন  সকলের  মধ্যে  একই  চিৎশক্তির  খেলা  চলছে। ধ্যানী  পুরুষের  ধ্যানদৃষ্টিতে  নদীর জলপ্রবাহের  মধ্যেও  একটা  অতীন্দ্রিয়  সত্ত্বা  উদ্‌ঘাটিত  হয় এতে  আশ্চর্য  হবার  কিছু  নেই।


নর্মদা, তিনি  রুদ্রকন্যা। স্বয়ম্ভু  মহাদেবের  তেজ  হতে  তাঁর  জন্ম। গঙ্গার  অপার  মহিমার  কথা  স্মরণে  রেখেও  মহর্ষি  ভৃগু কর্দম  কপিল  দুর্বাসা  অণীমাণ্ডব্য  প্রভৃতি  বৈদিক ঋষিরা  বলেছিলেন---



নর্মদা  সরিতাং  শ্রেষ্ঠা  রুদ্রতেজাং  বিনিঃসৃতা।
তারয়েৎ  সর্বভূতানি  স্থাবরানি  চরানি  চ।।

নর্মদা  সমস্ত  নদীকুলের  মধ্যে  শ্রেষ্ঠা; রুদ্রের  তেজ  হতে  সমুৎপন্না; স্থাবর  জঙ্গম  সমস্ত  কিছুকেই  তিনি  ত্রাণ  করেন। সর্বসিদ্ধিমেবাপ্নোতি  তস্যা  তটপরিক্রমাৎ। শুদ্ধচিত্তে  তাঁর  তট  পরিক্রমা  করলে  সর্বসিদ্ধি  করায়ত্ত  হয়।

মহাভারতের  বনপর্বে  পুলস্ত্য  মুনি  যুধিষ্ঠিরকে  আশীর্বাদ  করে  বলেন, তুমি  অন্যান্য  তীর্থেতো  যাবেই, বিশেষ  করে  ত্রিলোক  প্রসিদ্ধ  নর্মদাকে  অতি  অবশ্যই  দর্শন  করে  আসবে। নর্মদাতে পিতৃপুরুষ  এবং  দেবতাদের  পূজা  তর্পন  করলে  অগ্নিষ্টোম যঞ্জানুষ্ঠানের  ফল  লাভ  হয়।

নর্মদা  পরিক্রমা  করতে  করতে  জীব-জীবন  হতে  শিব-জীবনে  উত্তরণ  ঘটে, শুধু  বারদীর  লোকনাথ  ব্রহ্মচারী  বা  দিগম্বরজী  নয়, যুগ  যুগ  ধরে  সহস্র  সহস্র  পরিক্রমাকারীর  জীবনে  নর্মদামায়ীর আশীর্বাদ  এইভাবেই  নেমে  এসেছে।

তাই  মহর্ষি  মার্কণ্ডেয়  ভৃগু  কপিল  দুর্বাসা  থেকে  আরম্ভ  করে এযুগের  কমলভারতীজী, গৌরীশঙ্করজী  প্রভৃতির  দিব্যজীবনের  প্রত্যক্ষ  ঘটনা  স্মরণে  রেখেই  শাস্ত্রকাররা  বলেছেন--- নর্মদার নিত্য  জলপান, নিত্যস্নান  এবং  তাঁর  তটে তটে  যেসব  শিবলিঙ্গ তার  অর্চনা  করতে  করতেই  জীবের  দুর্গতি  নাশ  হয়। মর্ত্তজীবনেই অমর্ত্তজীবনের  সন্ধান  মিলে।

নর্মদা --- মধুনিস্যন্দিনী  সংস্কৃত  ভাষায়  ঋষিদের  অত্যন্ত  তাৎপর্যময়  এই  শব্দটি  মূর্তিমতী  "গায়েত্রী"র  মতই  ত্র্যক্ষরা। নর্মন্‌  ধাতু  হতে  শব্দটি  নিষ্পন্ন, নর্মন্‌  দদাতি  ইতি নর্মদা। নর্মন্‌  হচ্ছে  নৃ  ধাতুর  উত্তর  মন্‌  ও কর্তৃবাচ্যে। নর্ম  মানে  কি? নর্ম  মানে  হচ্ছে  ক্রিয়া, নর্ম  মানে  হচ্ছে  খেলা, প্রিয়ত্ব বা বিহার।

নর্ম ---- দা + ড = নর্মদা। নর্মন্‌  দদাতি  অর্থাৎ  আনন্দ --- বিলাস  যিনি  দান  করেন।

ব্রহ্মের  যে  আনন্দ---বিলাস, জগৎ জুড়ে  সে  আনন্দের  লীলা  চলছে, উপনিষদে  আছে --- আনন্দাদ্ধেব  ঋল্বিমানি  ভূতানি  জায়ন্তে, আনন্দেন  জাতানি  জীবন্তি --- আনন্দ  থেকে  জাত, আনন্দের  বুকে  সবাই  আছে। অন্তে  এই  আনন্দেই  সব  লয়  পাবে --- আনন্দব্রহ্মের  সেই  অলৌকিক  আনন্দ---বিলাস  দেখবার  বুঝবার এবং অনুভব  করার  ক্ষমতা  যিনি  দান  করেন  তিনিই  নর্মদা।

মার্কণ্ডেয়জীকে  মা  নর্মদা  বলেছিলেন ---  প্রতি  কল্পান্তকালে  প্রলয়  পয়োধি  নীরে  সেই  অন্তহীন  একার্ণবে  একাকী  যখন  সন্তরণ  করতে  থাকবে  তখন  আমিই  তোমাকে  রক্ষা  করব।


নর্মদা  তীর  হল  তপস্যা  ক্ষেত্র। এখানে  অঙ্গিরা, আঙ্গিরস, সনক, দীর্ঘতমা, জৈগীষব্য, অণীমাণ্ডব্য  প্রভৃতি  বৈদিক  ঋষিরা  ছাড়াও  এসেছেন  এখানে  আদি  বিদ্বান  কপিল, মহামুনি  মার্কণ্ডেয়, মৎস্যেন্দ্রনাথ, গোরক্ষনাথ, পতঞ্জলি, গোবিন্দপাদ  এমনকি  ভারতীয়  দর্শন  ও  সংস্কৃতি  যিনি  কোহিনুরস্বরূপ  সেই  আদি শংকরাচার্যও  এসেছিলেন  এখানে  তপস্যা  করতে। কত যে  প্রবর্ত্তক  ব্রহ্মচারী, মুনি, ঋষি, ব্রহ্মবিদ্‌, ব্রহ্মবিদ্‌বর, ব্রহ্মবিদ্‌বরীয়ান  ব্রহ্মবিদ্‌বরিষ্ঠ  নর্মদায়  এসে  তপস্যা  করেছেন  কোন  ইয়ত্তা  নেই।

পরিক্রমার  প্রধান  নিয়মঃ---

1. নিরন্তর  রেবা  মন্ত্র  জপ।

2. নর্মদা  জলধারাকে  সর্বদা  চোখে  চোখে  রেখে  পরিক্রমা।

3. কোনমতেই  নর্মদার  জল  লঙ্ঘন  বা  অতিক্রমা  করা  যাবে  না। অতিক্রম  করা  হলেই  পরিক্রমা  খণ্ডিত  হবে।

4. পরিক্রমাকালে  মন্দির  চোখে  পড়লে, নর্মদার  জলে  শিবলিঙ্গের  অর্চনা।

5. পদব্রজেই  পরিক্রমা  করতে  হয়, পায়ে  জুতা, যানবাহন, কুলিমজুর  নিষিদ্ধ, নিজের  আবশ্যকীয়  দ্রব্য  নিজেকেই  বহন  করতে  হবে।

6. বড়  জোর  একদিনের  খোরাক  ছাড়া  বেশী  খাদ্যবস্তু  ঝুলিতে  রাখা  যাবে  না।

7. সত্য, ব্রহ্মচর্য  ও  সদাচার  পালন। সর্বাবস্থায়  নর্মদা  মায়ীর  উপর  নির্ভরতা।

8. বেশী  জলে  নামা  নিষিদ্ধ।

নর্মদার  শরণ  নিলেই  মা  নর্মদাই  পরিক্রমাকারীর  যোগ ও ক্ষেম (অপ্রাপ্য  বস্তুর  প্রাপ্তি  ও  প্রাপ্তি  বস্তুর  রক্ষা)  বহন  করে  থাকেন।

নর্মদা  পরিক্রমাকালে  তিনটি  বিষমস্থল  অতিক্রম  করতে  হয়।

প্রথমতঃ মুণ্ডমহারণ্যের মত  ঘন, প্রস্তর ও কণ্টকাকীর্ণ  বনভূমি  যেখানে পাখীও  স্বচ্ছন্দে  ডানা  মেলে  উড়তে  পারে  না। পূর্বে  সিংহ  ছিল, এখন  হিংস্র  ব্যাঘ্র, ভল্লুক, হায়েনা, চিতা, বিষধর  সর্পে  পরিপূর্ণ। এই  বন  ৮০ ক্রোশ  অর্থাৎ  ১৬০  মাইল  লম্বা, ১০ মাইল চওড়া।

দ্বিতীয়তঃ  ওঙ্কারেশ্বর  পর্যন্ত  সমতল  মালভূমি ও জঙ্গলসহ  প্রায়  ৫০০ মাইল  লম্বা।

তৃতীয়তঃ  ভয়ঙ্কর  শূলপাণির  ঝাড়ি। যা  ১০০ মাইল  লম্বা,  অতি দূর্গম  কষ্টকর  পথ। শূলপাণির  ঝাড়ির  পাথর  সূঁচলো।


এই  তিনটি  জঙ্গলেই  পরিক্রমাকারীর  পক্ষে  বিষম  পরীক্ষার  স্থল। এই  তিনটি  স্থানেই  কাঁটা  ও  পাথরের  জন্য  পথ  চলা  অতি  দুষ্কর। কোন  কোন  স্থানের  বিশেষতঃ  শূলপাণির  ঝাড়ির  পাথর  ঠিক  যেন  ছুঁচ  বা  ছুরির  মত  ধারালো, তার  উপর  দিয়ে  হেঁটে যাওয়া  অত্যন্ত  কষ্টকর। হাঁটবার  সময়  পথের  কষ্টে  চোখে  জল  আসে। অনেক  সময়  পায়ে  কাপড় ও চট  জড়িয়ে  হাঁটতে  হয়।


নর্মদার  আর  একটি  বিশেষত্ব  হল  নর্মদা  মাতা  পরিক্রমাকারীদের  কারও কোন  নিয়ম  বরাবর  রাখেন  না, নিয়ম  ভেঙে  দেন। কাউকে  একত্র  বা  দলবদ্ধভাবে  থাকতে  দেন  না। অন্ততঃ এক দিনের  জন্য  হলেও  প্রত্যেককে  পৃথক  করে দেন। কখনও  কখনও  প্রায়ই  ঘোর  জঙ্গলে  একাকীই  রাত্রি  যাপন  করতে  হয়। তখন  নর্মদা  মাতাই  তাঁর  ভক্তকে  রক্ষা  করেন।  কখনও  কোন  পরিক্রমাকারী  হিংস্র  জন্তু  বা  সাপের  দংশনে  মারা  গেছেন  এরকম  শোনা  যায়  নি।


পরিক্রমাকালে  নর্মদাকে  অনবরত  চোখে  চোখে  রেখে  পরিক্রমা  করতে  হয়  ও  নিরন্তর  রেবা  মন্ত্র  জপ  করতে  হয়।


মহাকণ্যকা  শক্তি   নর্মদার  স্থূলরূপ  হল  এই  নর্মদার  জলপ্রবাহ। নর্মদার  জলের  দিকে  তাকালেই  বিশ্বের  আদিকারণভূতা  মহাশক্তি  শিবপুত্রী  নর্মদাকে  স্মরণ  মনন  হয়ে  যায়। তারমধ্যেই  সমস্ত  দেবশক্তি  ও  দিব্যশক্তির  প্রকাশ  আছে। স্বয়ং  মহেশ্বরের  বরে  তাঁর  তেজোসম্ভূতা  রেবা  শৈবতেজের  মূর্ত  প্রতিমা। মহেশ্বরের  শ্রীমুখনিঃসৃত  বিধান  এই  যে, নর্মদা  পরিক্রমাকালে  রেবামন্ত্র  জপ  করতে  হয়। নর্মদাকে  চোখে  চোখে  রেখে  স্বীয়  ইষ্টমন্ত্র  জপ  করলেও  নর্মদা  সদৈব  তুষ্ট  থাকেন। শিব  বাক্যকে  মর্যাদা  দেবার  জন্য  রেবারন্ত্র  জপ  করাই  কর্তব্য।


রেবামন্ত্র  মানে  রেবার  মন্ত্র। সেটি  "রেবা  রেবা"  শব্দ  মাত্র  নয়। "রেবা" শব্দ  হতে  পৃথক  কিছু।


রেবামায়ীর  বীজ  ষড়ক্ষর। "ওঁ হ্রাঁ হ্রোং হ্রৃং হ্রৈং হ্রৌং হ্রঃ"। 

এই  মন্ত্রকে  প্রণব  দিয়ে  পুটিত  করলে  সপ্তাক্ষর  হবে, তখন  তা শিবের  সপ্তাক্ষর  মহাবীজের  সমতুল্য। এই  সপ্তাক্ষরের  শেষে "নর্মদায়ৈ  নমঃ" যোগ  করলে  সেই  ত্রয়োদশাক্ষর  বীজের  দ্বারা ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরাদি  সমূহ  দেবদেবীর  পূজা  ও  স্মরণ  মনন  পূর্ণাঙ্গ হয়ে  থাকে।

নর্মদা  পরিক্রমার  ফল  মেলে  হাতে  হাতে, তা  সে  রুণ্ডা  পরিক্রমা হোক  বা  জলে-হরি  পরিক্রমা  হোক। নর্মদা  পরিক্রমা  হল  একটি সম্পূর্ণ  যোগ  প্রক্রিয়া। পিতৃ-মাতৃ বীজ  বুকে  নিয়ে   যিনি  সাচ্চা  মনে মা  নর্মদাকে  স্মরণে  রেখে  পরিক্রমা  সম্পূর্ণ  করেন, তিনিই  সাচ্চা যোগী। এরজন্য  কোন  ক্ষণ  অবলম্বন  করে  সকাল, বিকাল, সন্ধ্যা বিকৃত  অঙ্গভঙ্গী  বা  নাক কান  টেপাটেপী্র প্রয়োজন  হয় না। মননশীল  সাধক  স্বদেহেই  জ্যোতিঃস্বরূপ  বিশ্বসাক্ষী  পরমাত্মাকে দর্শন  করেন।


https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191



Monday, April 15, 2013

ভব  ভয়  ভঞ্জন                 পুরুষ  নিরঞ্জন
রতিপতি   গঞ্জনকারী,
যতি--জন--রঞ্জন              মন--মদ--খণ্ডন
জয়  ভব--বন্ধন--হারী।।
জয়  জন--পালক                সুর  দলনায়ক
জয়  জয়  বিশ্ববিধাতা,
চিরশুভ  সাধক                 মতি  মলপাবক
জয়  চিত  সংশয়ত্রাতা।।
সুর  নর  বন্দন                   বিজয়--বিবর্দ্ধন
চিতমলনন্দনকারী,
রিপুচয়মন্থন                   জয়  ভবতারণ,
স্থল--জল--ভূধর--ধারী।।
শমদমমণ্ডন                    অভয়--নিকেতন
জয়   জয়  মঙ্গলদাতা
জয়  সুখ  সাগর                    নটঘর  নাগর
জয়  শরণাগত  পাতা
ভ্রমতমভাস্কর                     জয়  পরমেশ্বর
সুখকর  সুন্দরভাষী,
অচল  সনাতন                  জয়  ভবপাবন
জয়  বিজয়ী  অবিনাশী।।
ভকত   বিমোহন                        বরতনুধরণ
উদগীথ  কীর্ত্তন  ভোলা
গদগদ   ভাষণ                     চিতমনতোষণ
ঢলঢল   নর্ত্তনলীলা।।
মতিগতিবর্জ্জন               কলিমলমর্দন
বিষয়--বিরাগ  প্রসারী,
জয়--চিত  চেতক                       ভব  জল  ভেলক
জয়  নর--মানস--চারী।।
জয়   পুরুষোত্তম                    অনুপম  সংযম
জয়   জয়  অন্তরযামী,
খরতর  সাধন                        নর  দুঃখবারণ
জয়  গুরুদেবনমামি।।




(শুভ  নববর্ষ  ১৪২০)

Friday, April 5, 2013


আত্মা  তুমি, শক্তি  তব  মতি-বুদ্ধি  মোর,
আঞ্জাবহ  তব  বায়ু ------ মোর  পঞ্চপ্রাণ ------
এ  শরীর  তোমারি  ত  প্রিয়  বাসস্থান।
উপভোগ  তরে  মোর  যে  ভোগ  রচনা
তোমারি  ত  সে  সকল  পূজার  বিধান,
নিদ্রা  সে  তো  সমাধিতে  সুখে  অবস্থান।
ভোজন  আমার  আহূতি  প্রদান, শয়ন  আমার  সাষ্টাঙ্গ  প্রণাম।
ভ্রমণ  আমার  প্রদক্ষিণ  তাঁর  প্রতি  কথা  মোর  মন্ত্র,
যেভাবেই  বসি  সেই  ত  আসন, প্রতি  অঙ্গভঙ্গী  মুদ্রা  বিরচন
যে  চিন্তাই  করি  তাঁরই  ধ্যান  করি  এ  জীবন  তাঁর  যন্ত্র।।



Tuesday, March 26, 2013



দোলযাত্রার পুণ্যক্ষণে  "মা নর্মদার " বরপুত্র  "তপোভূমি  নর্মদা "র  লেখক  স্বর্গীয়  শৈলেন্দ্রনারায়ণ  ঘোষাল  শাস্ত্রীজীর  জন্মদিনে  তাঁকে  জানাই  সশ্রদ্ধ  প্রণাম। 




উঠিছে  ফুটি'
আমার  মনের  আঁখির  সুমুখে  সে  আঁখি  দুটি।
স্নেহ  ঢল  ঢল  করুণাবিহ্বল  আঁখির  পাতা
যত  ভাবি  মনে  গুমরিয়া  ওঠে  নীরব  ব্যথা;
দু'ফোঁটা  অশ্রু  ভাব-হিল্লোলে
চুমিয়া  নিভৃতে  দুইটি  কপোলে
পড়িছে  লুটি',
পাশরিতে  মুখ  ধ্যানাসন  ছাড়ি  পলানু  ছুটি।।
যে  ক'টি  লেখা
কার্ডে  খামে  যাহা  মোর  লাগি  তুমি  এঁকেছ  রেখা।
সেই  লেখাগুলি  রাখিয়াছি  আজো  যতন  করে,
নিতি  দেখি  তবু  সাধ  বেড়ে  যায়  দেখারই  তরে।
লেখাগুলি  লয়ে  বাতায়নে  বসি
অনিমেখ  আঁখি  যাপি  সারা নিশি
জাগিয়া  একা,
জানি না  আবার  পাব  কি  না  পাব  তোমার  দেখা।
উঠিছে  ভেসে
হাসিমাখা  মুখ 'বাবি'  বলে  যবে  ডাকিতে  হেসে;
সে  হাসির  ছ'টা  ভুলিনি  কখনো --- সে  নিরুপম
ক্ষণে  ক্ষণে  তাহা  জেগে  ওঠে  মনে  বিজলী  সম।
সাঁঝে  নিরালায়  জপে  ধ্যানাসনে
দেখি  তাহা  নিতি  শয়নে  স্বপনে
মরম  দেশে,
দেখা  দাও  পিতঃ  পুনরায়  সেই  কৃপালু  বেশে।।

তাই
তোমাতে  মন  করে  অর্পণ, ঢেলেছি  মন  তোমার  ঝুলিতে
 লঘু  হবে  ভার, রবে  নাকো  আর  ভবের  দোলায়  দুলিতে।।


Most Blessed,
Ananda Mohan Ghosal (only Son)
Debhuti Ghosal (only Grand daughter)




  

Tuesday, March 12, 2013

ব্রহ্মানন্দদেব:---


'প্রায়  উনিশ  শত  বৎসর  পূর্বে  গঙ্গাসাগর  সঙ্গমের  নিকট  ক্ষুদ্রকায়  কাকদ্বীপে  আদিগুরু  মহাযোগী  অতিবৃদ্ধ  ব্রহ্মানন্দদেব  বাস  করতেন। তাঁর  আশ্রমের  নাম  ছিল 'আনন্দমঠ'


সেই  আনন্দমঠে এক  বিশাল  বটবৃক্ষমূলে এক বিশাল  প্রস্তর  খণ্ডের  উপর  তিনি  বসে  থাকতেন। তাঁর  কোন  কুটীরও  ছিল  না।গ্রীষ্মের  দাবানল  বা  শীতের প্রকোপও  তিনি  গ্রাহ্য  করতেন  না।  


সেই  মহাযোগী  দীর্ঘকাল  নর্মদাতটের  হিরণফালে  এসে  তপস্যা  করেছিলেন। দীর্ঘকাল  তপস্যা  করার  পর  তিনি  নিজ  মাতৃভূমি ঐ  কাকদ্বীপে  ফিরে  যান। সাগর- সঙ্গমে  যাঁরা  যান, তাঁরা  যেমন  কপিলমুনির  আশ্রমে  গিয়ে  প্রণাম  করতেন, তেমনি  ঐ ব্রহ্মানন্দদেবের  শিলাতলেও  শ্রদ্ধার্ঘ্য  নিবেদন  করে  আসতেন'।


একবার  স্বয়ং শঙ্করাচার্য  অদ্বৈতবাদ  প্রচার  করতে  করতে বাংলাদেশে  পৌঁছে  কাকদ্বীপে  গিয়ে  আদিগুরু  ব্রহ্মানন্দদেবের  নিকট বিচার  প্রার্থনা  করে  বসেন। তিনি  বলেন--- মহাত্মন! আমি  দক্ষিণদেশ  জয়  করে  রামেশ্বর  ক্ষেত্রে  শৃঙ্গেরী  মঠ  প্রতিষ্ঠা  করেছি যুধিষ্ঠিরাব্দ  ২৬৪৮  সালে।
ঐ মঠের মহাবাক্য--"তত্ত্বমসি"।

পশ্চিম  প্রদেশ  জয়  করে  যুধিষ্ঠিরাব্দ  ২৬৫০  সালে  সারদা  মঠ  প্রতিষ্ঠা  করেছি।
ঐ মঠের মহাবাক্য--"অহং ব্রহ্মাস্মি"।

আর্যাবতের  উত্তরপ্রদেশে  অদ্বৈতমতের  বিচারে  জয়লাভ  করে  বদরিকার মুক্তিক্ষেত্রে  যোশী মঠ  বা  জ্যোতির্মঠ  প্রতিষ্ঠা করেছি ২৬৫২ সালে।ঐ মঠের মহাবাক্য--"অয়মাত্মা  ব্রহ্ম"। এখন  আপনাকে  বিচারে  পারভূত  করে  বঙ্গদেশে  অদ্বৈতমতের  চতুর্থ  মঠ  প্রতিষ্ঠার  উদ্দেশ্যে  আপনার  সঙ্গে  বিচার  প্রার্থনা  করি।


আচার্য  শংকরের  কথা  শুনে  মহাযোগী  বলেন--- বৎস! তাহলে  তুমি  স্পষ্ট  করে  বল  তোমার  বিচার্য  বিষয়  বেদান্তের  অদ্বৈতবাদ।

আচার্য --- হ্যাঁ, পূর্বেই  স্পষ্ট  করে  বলেছি, আমার  বিচার্য  বিষয়  অদ্বৈতবাদ।


মহাযোগী --- বৎস! তোমার  যথার্থ  অদ্বৈতঞ্জান  জন্মাতে  এখনও  বহু  বিলম্ব।


শংকর --- আপনি  কি  করে  তা  জানছেন, তা  খুলে  বলুন।


মহাযোগী --- বৎস! প্রকৃত অদ্বৈতবাদ  বুঝলে, অদ্বৈত  ব্রহ্মতত্ত্বে  প্রতিষ্ঠিত  হতে  পারলে, তুমি  তোমার  এবং  আমার  মধ্যে  কোন  প্রভেদ  দেখতে  পেতে  না, তুমি এবং আমি  যে  দুটি  স্বতন্ত্র  জীব এ  বোধ এখনও তোমার  যায়  নি। তাই  তুমি  আমাকে  বিচার  যুদ্ধে  আহ্বান  করতে  পারছ। তোমার  দ্বৈতঞ্জান  এখনও  তিরোহিত  হয়নি  বলেই  তুমি  দ্বিতীয়  ব্যক্তিকে  তোমা  হতে  স্বতন্ত্রঞ্জানে  বিচারে আহ্বান করছ।যখন  তোমার  দ্বৈতভাব  চলে  যাবে  তখন  তোমাতে  আমাতে  সর্বভূতে  কোন  পার্থক্য  দেখতে  পাবে  না। তখন  দেখবে  চারিদিকে  এক  খণ্ড  ব্রহ্ম, জগৎময়  অদ্বৈত  ব্রহ্মলীলা। আমি  বোধ  গেলেই  তুমি  বোধ  আসে, আমিত্ব  ঘুচে  গেলেই  তুমি  আসে। তুমি  ছাড়া  আমি  নাই, আমি  ছাড়া  তুমি  নাই---



তুঁ  তুঁ  করতা  তুঁহি  রহা  মুঝ্‌মে  তুহিনা  হুঁ।
বলিহারি  তেরে  রূপ  কি  যিৎ  দেখুঁ  তিৎ  তুঁ।

অর্থাৎ  তুমি  তুমি  করতে  করতে  আমি  তুমিময়  হয়ে  গেছি, তুমি  ছাড়া  আর  কিছু  দেখতে  পাচ্ছি  না  আমার  মধ্যে।  তুমি  ছাড়া  আর  কোথাও  কিছু  খুঁজে  পাচ্ছি  না। আমার  আমিত্ব  লুপ্ত  হওয়ায়  আমি  তোমার  স্বরূপত্ব  প্রাপ্ত  হয়েছি। প্রভু, তোমার  রূপের  বলিহারি  যাই, যে  দিকেই  দৃষ্টি  পড়ে, দেখি  সেখানেই  তুমি --- তুমি  ছাড়া  জগতে  আর  কিছু  নাই।

মহাযোগীর  কথার  মর্ম  উপলব্ধি  করে  শঙ্করাচার্য  অভিভূত  হয়ে  পড়েছিলেন। তিনি  মহাযোগীর  পদধূলি  নিয়ে  বলে  উঠেন ---বাংলাদেশে  পৃথক  কোন  মঠ  স্থাপনের  কোন  উপযোগীতা  দেখছি  না,  আপনার  আনন্দমঠের  কীর্তি  চারদিকে  ঘোষিত  হোক।

এই  বলে  শংকরাচার্য  কাকদ্বীপ  ত্যাগ  করে  পূর্বদিকে  পুরীতে  গিয়ে  জগন্নাথ  ধামে  সমুদ্রতীরে  তাঁর  চতুর্থ  মঠ  গোবর্ব্ধন  মঠ  স্থাপন  করেন।


অতিবৃদ্ধ  মহাযোগীর  আনন্দমঠই  ছিল  শৈবাগম  তন্ত্রের  পীঠস্থান।



https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191

Friday, February 22, 2013


মাতাপিতাই  জন্মদান  করেছেন, তাঁরাই  পালন কর্তা, সন্তানের  কাছে তাঁরাই  ব্রহ্মস্বরূপ। অতএব  তাঁদেরকেই  প্রণাম  করি, তাঁদেরই  পূজা করি। সাক্ষাৎ  দেবতাকে  পরিত্যাগ  করে  যে  ব্যক্তি  অসাক্ষাৎ অদৃশ্য দেবতার  সেবা  করে  সেই  পাপাত্মা  পরলোকে  তির্যগ্‌যোনি  প্রাপ্ত হয়। পিতা  সর্বদেবের  আবাসভূত  সুমেরু  পর্বত  হতে  শ্রেষ্ট, তিনি সাক্ষাৎ  সনাতন  ধর্মের  মূর্তিস্বরূপ, অতএব  তাঁর  পাদোদক  স্নানের যে  ফল, তার  ষোড়শাংশও  গঙ্গা  স্নানে  হয়  না। কাশী  ওঁকারেশ্বর প্রভৃতি  মুক্তিক্ষেত্রাদিতে  শতশত  জ্যোতির্লিঙ্গ  দর্শনে  যে  ফল  হয়, পিতামাতা  দর্শনের  ফল  তার  কোটিগুণের  অধিক। দ্বাত্রিংশ  সংখ্যক শালগ্রাম  শিলা স্পর্শে  যে  ফল, পিতামাতাকে প্রদক্ষিণ  করলে তার কোটিগুণ  ফল  লাভ  হয়।

https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191

Tuesday, February 12, 2013


তারকব্রহ্ম নাম 'রাম' শব্দ ঔর 'ওঁ' বরাবর একই জিনিষ।

যথৈব বটবীজস্থ প্রাকৃতশ্চ মহাদ্রুমঃ।
তথৈব রামমন্ত্রস্থ বিদ্যতে চরাচরং জগৎ।।

অর্থাৎ যেমন বটগাছের একটি বীজের মধ্যে ঐ বিরাট মহীরুহের শাখা প্রশাখা পাতা ও ফল সুপ্ত থাকে, তেমনি রাম শব্দের মধ্যে এই বিশ্ব চরাচর সুপ্ত আছে।

তাই 'রাম' শব্দ বিশ্লেষণ করলে পাই---

রাম = র্‌ + আ + ম্‌ +অ।
= র্‌ + অ + অ + ম্‌ + অ।।

স্বরবর্ণ মাত্রই পুংলিঙ্গ এবং স্বাধীন। ব্যঞ্জনবর্ণ মাত্রই  স্ত্রীলিঙ্গ, পরাধীন।


'আদ্যন্ত বিপর্যয়শ্চ'---পাণিনির এই সূত্রানুসারে বিশ্লেষিত 'রাম' শব্দের 'অ' সামনে এল।  তাহলে দাঁড়াল---অ + র্‌ + অ + অ + ম্‌। ব্যাকরণের নিয়ম হচ্ছে যে, যদি কোন শব্দের 'র' বর্ণে্র পূর্বভাগে এবং উত্তরভাগে যদি 'অ' বসে তবে তার 'র' বর্ণ 'উ' বর্ণে পরিণত হয়। 


ফলে রাম শব্দের অন্ত্যভাগের র্‌ + অ = উ হয়ে যায়।

অ + র্‌ + অ = উ
অর্থাৎ উ + অ = ও হল।।
ও + ম্‌ = ওম্‌  বা  ওঁ হয়ে গেল।।

এইভাবে রাম শব্দের মধ্যে "ওঁ" লুক্কায়িত আছে। তাই ঋষিদের উপলব্ধি ওঁকারতত্ত্ব মনন করলে যেমন কোন বস্তুই অপ্রাপ্ত থাকে না, 'রাম' শব্দ মনন করলেও কোন বস্তুই অপ্রাপ্ত থাকে না। ওঁকার যেমন মোক্ষ দান করে 'রাম' এই সিদ্ধ শব্দও মোক্ষ দান করে। তাই রামমন্ত্রকে বলা হয় তারকব্রহ্ম নাম।



https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191