Tuesday, May 15, 2012

উত্তরা সুষুম্নাই উত্তরাপথ; উত্তরায়ণের পথ; সাক্ষাৎ ব্রহ্মমার্গ:-



বেদের নির্দেশ পিতাকে ঈশ্বরঞ্জান।পিতৃমেধ, পিতৃযঞ্জ, মহাপিতৃযঞ্জ, পিণ্ডপিতৃযঞ্জ, পিতৃঅর্চনা প্রভৃতি বৈদিকযঞ্জ পিতৃপূজারই নামান্তর।বৃহদারণ্যক উপনিষদে মনুষ্যলোক, ধ্যান ধারণা ও তপস্যাদি দ্বারা পিতৃলোক এবং বিদ্যাদ্বারা দেব-লোককে জয় করা যায়---


সোহয়ং মনুষ্যলোকঃ পুত্রেণৈব জয্যো নান্যেন কর্মণা, কর্মণা পিতৃলোকঃ, বিদ্যয়া দেবলোকঃ।


এখানে জয়ের অর্থ তৎ তৎ লোকের কর্তব্যকর্ম সাধনার দ্বারা পরিপূর্ণ ও সার্থক করে তোলা।উক্ত শ্রুতিমন্ত্রের ভাষ্য করতে গিয়ে ঞ্জান-ভাস্কর শংকরাচার্য বলেছেন---


তেষাং সোহয়ং মনুষ্যলোকঃ পুত্রেণৈব সাধনেন জয্যঃ জেতব্যঃ সাধ্যঃ।


এই ঋষিবাক্যের উদ্দেশ্যে ও আশয় হল ঘটনাক্রমে যদি পিতার কোন কর্তব্য কর্ম যথা দান, তপস্যা, অধ্যয়ন, সমাজঋণ, দেবঋণ, ঋষিঋণ প্রভৃতি বাকী থাকে, তাহলে তা পূরণ করে পিতাকে ঋণ মুক্ত করা পুত্রের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। সেই সঙ্গে নিজেও পিতৃচিন্তায় বিভোর হয়ে কৃতকৃত্য হতে পারলে তবেই সন্তান 'পুত্র' নামের যোগ্য।


তস্মাৎ---পূরণেন ত্রায়তে স পিতরম্‌ যস্মাৎ তস্মাৎ পুত্র নাম।


পুত্র কেবল সারা জীবন ধরে একতরফাভাবে মাতাপিতার প্রাণঢালা ভালবাসা আদরযত্ন এবং তাঁদের পরিত্যক্ত বিষয় সম্পত্তির উত্তরাধিকার ভোগ করবে, যথেচ্ছভাবে তাঁদের নিঃস্বার্থ ভালবাসার সুযোগ নেবে এমন কোন সার্বভৌম জন্মসত্ত্ব নিয়ে পুত্রকন্যা পৃথিবীতে আসে নি। মাতাপিতার প্রতিও পুত্রকন্যার তীব্র সাধন-সাপেক্ষ কিছু কর্তব্য আছে। পিতার যে সব ছিদ্র অর্থাৎ অপূর্ণতা থাকে তা পরিপূরণ করতে পারলে তবেই পুত্রের পুত্রত্ব----


ইদং তৎ পুত্রস্য পুত্রত্বম্‌, যৎ পিতুশ্ছিদ্রং পূরয়িত্বা ত্রায়তে।


সত্যদ্রষ্টা ঋষিরা বলেছেন মৃত্যুর পর পিতাতে হিরণ্যগর্ভের সমুদয় অমরপ্রাণ প্রবেশ করে অর্থাৎ তখন তাঁর মর্ত্ত্যভাব চলে যায়; তাঁর প্রাণরশ্মি মৃত্যুর পরে হিরণ্য-গর্ভলোকে বিরাজমান থাকে।তাই বৈদিক পিণ্ডপিতৃযঞ্জে পিতার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভোজ্য বস্তুকে পৃথিবীরূপে এবং পিতাকে তার অধিষ্ঠাতৃদেবতা অগ্নিরূপে ধ্যান করার বিধান আছে।পিতার প্রতি পুত্রের কেবল ঐহিক কর্তব্য নয়, নিজের পূর্ণতার জন্যই পিতাকে কেন্দ্র করে কিভাবে সিদ্ধ সাধনায় ব্রতী হওয়া যায়, বেদ উপনিষদ ঘোষিত সেই পিতৃলোক কোথায়, কিভাবেই বা পিতাকে ধরেই জীব মুক্তি-সরণীতে পদক্ষেপ করতে পারে।


বর্তমানে হিন্দুসমাজে স্মৃতিশাস্ত্র ও পুরাণের (বায়ুপুরাণ, গরুড়-পুরাণ প্রভৃতি) বিধান অনুসারে মাতৃপিতৃশ্রাদ্ধ কালে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে কুশের উপর পিণ্ডদানাদির যেমন ঘটা দেখা যায়, বৈদিক ধারণায় এই সব আচার অনুষ্ঠানের বিধি বিধান ছিল না।


পালি সাহিত্যে স ংস্কৃত শ্রাদ্ধ কথাটির অনুরূপ শব্দ পাই 'সদ্ধ'।


এই সদ্ধ শব্দটির অর্থ বৌদ্ধ ধারণায় মৃত আত্মীয়ের উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মণ গণকে খাদ্য ও অন্যান্য বস্তুদান রূপ প্রেতকৃত্য।


বর্তমান হিন্দুসমাজে প্রচলিত শ্রাদ্ধ-ব্যবস্থায় তার ছায়া পড়েছে।মৃত মাতাপিতার উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি উপায় হিসাবে দেখলে এতে কোন আপত্তি করার কারণ দেখি না।


কিন্তু নিজের তথাকথিত Status বজায় রাখা এবং নিজ অহ ং-এর স্ফুর্ত্তি ও পূর্ত্তি সাধারণতঃ ঐ সব অনুষ্ঠানের প্রধান অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে আজকাল।


মাতা-পিতার জীবদ্দশায় যে নারকীপুত্র শ্রদ্ধা ও প্রেমবশতঃ তাঁদের সেবাপূজা করল না,তাঁদের দেহান্তের পরেই দেখি তারা শ্রাদ্ধের ঘটা করতে কুণ্ঠিত হয় না। একে প্রহসন ছাড়া আর কি বলা যায়?
বেদে সরাসরি শ্রাদ্ধ শব্দটি না থাকলেও বৈদিকযুগে এমন কি বৌদ্ধযুগের অব্যবহিত পূর্ব পর্যন্ত মাতাপিতার সেবাপূজাকেই পবিত্রতম যঞ্জ এবং পুত্রের অবশ্য প্রতিপাল্য কর্তব্য এবং সাধনার শ্রেষ্ঠ অঙ্গ হিসাবে বিবেচনা করা হত।


অনেক পণ্ডিতের মতে মহর্ষি পাণিনির আবির্ভাব বৌদ্ধ-পূর্ব-যুগে।
তিনি তাঁর বিখ্যাত অষ্টাধ্যায়ী সূত্রে শ্রাদ্ধ শব্দ ব্যবহার করেছেন। সূত্রটি হল-----


'শ্রাদ্ধম্‌ অনেন ভুক্তম্‌ ইণি ঠনৌ'।

এর অর্থ 'অনেন ভূক্তম্‌' এই অর্থে শ্রাদ্ধ শব্দের উত্তরে ইণি ও ঠন্‌ প্রত্যয় হয়। অনেন ভূক্তম্‌ মানে পিতার দ্বারা ভূক্তম্‌ অর্থাৎ মাতাপিতার ভোজন ক্রিয়া; সযত্নে জীবিত মাতাপিতাকে ভোজন করাতে হবে, নিজ হাতে সেবা পরিচর্যা করতে হবে।

পাণিনিরও পূর্ববর্তী মহাকবি ভাসের প্রতিমা নাটকের পঞ্চম অঙ্কে শ্রাদ্ধ শব্দটির প্রয়োগ আছে--- শ্রদ্ধয়া দত্তম্‌ শ্রাদ্ধম্‌। প্রচেতা রচিত শ্রাদ্ধকল্প নামক গ্রন্থের নামও এই নাটকে দেখতে পাওয়া যায় অর্থাৎ মহর্ষি প্রচেতার যুগেও মাতাপিতাকে ভক্তি ভরে সেবা পূজা, তাঁদের সর্ববিধ ইচ্ছার পূরণ, সর্বতোভাবে তাঁদেরকে সুখী ও তৃপ্ত করাকেই শ্রাদ্ধ হিসাবে গণ্য করা হত।

"জ্যান্তে দিল না ভাত কাপড়, মরলে করবে দান-সাগর"----

এ ধরণের জঘন্য রীতিকে শ্রাদ্ধ হিসাবে বৈদিক যুগে গণ্য করা হত না।
জীবিত মাতাপিতার সেবাপূজার পরিবর্তে তাঁরা মারা গেলে যে তথাকথিত শ্রাদ্ধপর্ব তার কোন মূল্য নেই।

কোন ব্যক্তি জীবিত না থাকলে তাঁর সেবা পূজা সম্ভব হয় না। সেব্য ও সেবক মিলিত হলেও তবেই সেবকের পক্ষে সেবা করা সম্ভব হয়। স্বামী দয়ানন্দ তাঁর ঋগ্বেদের ভাষ্য ভূমিকাতে বলেছেন---

"সেব্যসেবকসন্নিকর্ষাৎ সর্বমেতৎ কর্ত্তুং শক্যতে ইতি"।।

সারকথা জীবিত মাতাপিতার প্রত্যক্ষ সেবাপূজা করাই মুখ্য সাধনা।
জীবিত মাতাপিতার সেবা পরিচর্যা ছাড়া তাঁদের জীব্দদশাই এবং তাঁরা গত হলেও এমন একটি সিদ্ধ উপাসনা পদ্ধতি আছে, এমন এক সিদ্ধ মাতৃপিতৃবীজমন্ত্র আছে, যা সাধনা করলে ইষ্ট সাক্ষাৎকার হয়ে থাকে।

মাতাপিতার জীবিত থাকাকালে তাঁদেরকে উপেক্ষা করে তাঁদের মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধের ঘটা করা যেমন ভাবের ব্যাভিচার, তেমনি প্রত্যক্ষ সেবা পরিচর্যার পরিবর্তে অত্র প্রদর্শিত পন্থায় কেবল ধ্যানাসনে বসে ধ্যান জপ করলে তা বন্ধ্যা প্রহসনে পর্যবসিত হতে বাধ্য।

To  be  Continued........

Friday, April 13, 2012


তুমি  নির্মল  কর, মঙ্গল  করে  মলিন  মর্ম  মুছায়ে;
তব  পূণ্য  কিরণ  দিয়ে  যাক  মোর  মোহ  কালিমা  ঘুচায়ে।।
লক্ষ্য-শূণ্য  লক্ষ  বাসনা  ছুটিছে  গভীর  আঁধারে,
জানি  না  কখন  ডুবে  যাবে  কোন্‌  অকূল  গরল-পাথারে।
প্রভু, বিশ্ব-বিপদ-হন্তা,  তুমি  দাঁড়াও রুধিয়া পন্থা,
(তব) শ্রীচরণ-তলে  নিয়ে  এস  মোর  মত্ত  বাসনা  গুছায়ে।
আছ  অনল-অনিলে, চির  নভোনীলে,  ভূধর-সলিলে-গগনে,
আছ  বিটপী-লতায়, জলদের গায়, শশী-তারকায়  তপনে।
আমি  নয়নে  বসন  বাঁধিয়া  বসে  আঁধারে  মরিব  কাঁদিয়া,
আমি  দেখি  নাই  কিছু,  বুঝি  নাই  কিছু,  দাও  হে  দেখায়ে  বুঝায়ে।

  




Tuesday, March 13, 2012


হোম আরতি ঘি এর বাতি তপতপস্যার আড়ম্বর,
জপবো না নাম ন্যাস প্রাণায়াম করব নাকো অতঃপর।
কাজ কি মিছা জঞ্জালে,
কী হবে মোর চক্ষু মুদে
আসন পেতে বাঘছালে?
তুমিই আমার স্বর্গ পিতঃ!
তুমিই আমার দেবতাগো
দাও চরণের পুণ্যধূলি
আশিস্‌ তোমার মহার্ঘ!



Monday, March 12, 2012


যেদিন পিতার বিমল সত্তা
বুঝে নেবে প্রাণে প্রাণে
সেইদিন হ'তে জীবন তোমার
ভরে যাবে গানে গানে।




***********


যা পাবে মায়ের কাছে, তত স্নেহ কোথা আছে?
আর কারও প্রেমে তুমি ভুলিও না ভাই,
সে-সব প্রেমের সরা, সতর্কে ওজন করা
মা'র প্রেমে দরদাম কষাকষি নাই।




**************


যেদিন আমার জনম হ'ল সেদিনই ত দীক্ষা পেয়েছি,
এক অক্ষরের মন্ত্র 'মা'-এর ভিক্ষা পেয়েছি।
দীক্ষা বিনা চলে না যে একটি প্রাণের শ্বাস
সেই কথাতে গভীর আমার রয়েছে বিশ্বাস।
আমি নীর পেয়েছি
ক্ষীর খেয়েছি
পরাণ পেয়েছি
তারই সাথে 'ওঁয়া ওঁয়া ও-মা বলে ডাকতে শিখেছি
যেদিন আমার জনম হ'ল সেদিনই ত দীক্ষা পেয়েছি।।



Tuesday, March 6, 2012


দোলযাত্রার পুণ্যক্ষণে "মা নর্মদার" কৃপাধন্য "তপোভূমি নর্মদা"র লেখক স্বর্গীয় শৈলেন্দ্রনারায়ণ ঘোষাল শাস্ত্রীজীর জন্মদিনে তাঁকে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।


চলে গেছ তুমি, শুধু প্রান্তর ধূ ধূ করে অনিবার,
চারিদিকে ক্ষীণ কাশের শীর্ষ, দীনতা বাড়ায় তার।
আছে ঝটিকার প্রবল স্বনন, রোদের তীব্র জ্বালা,
নাই আর নাই ধূসর বেলায় তোমার ধর্মশালা।
যাও তরু তুমি, তোমার লাগিয়া ঝড়ে পড়ে আঁখিনীর ---

যাও মঙ্গল চামরছত্র কানন রাজশ্রীর।
যাও তাপিতের দয়ালবন্ধু সবল সরণ প্রাণ,
যাও অতীতের স্তম্ভ অরুণ, প্রকৃতির মহাদান।
তরুর মধ্যে অশ্বত্থ যিনি, বড় যাঁর কেহ নাই,
তাঁরি সাথে তুমি মিশে যাও পুনঃ, তাঁরি বুকে হোক ঠাঁই।।







Most Blessed,
Ananda Mohan Ghosal (only Son)
Debhuti Ghosal (only Grand daughter)


www.twitter.com/tapobhumi30

www.anandatapobhuminarmada.blogspot.com (Hindi)






Wednesday, February 15, 2012

খাড়েশ্বরী মহারাজঃ---


Cont (Last) .............. 

গুলজারী ঘাটের মন্দির দর্শনের পর বিন্ধ্যেশ্বরীজী বললেন---- 
গুরুজীকো ছোড়কে জ্যায়দা সময় বাহার মেঁ রহ্‌না ঠিক নেহি। গুলজারী ঘাটের শিবমন্দিরের দরজা খুলেছে। প্রণাম করে গুলজা গ্রামে ঠাড়েশ্বরী মহারাজের আশ্রমে ফিরে এলাম। 

তখনও অনেক বেলা আছে। এসে দেখলাম ঠাড়েশ্বরীজী সেই একইভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। বিন্ধ্যেশ্বরীজী তাঁর গুরুদবকে প্রণাম করে কুটিরে গিয়ে ঢুকলেন, আমি নর্মদার ঘাটে গিয়ে বসলাম। মনের মধ্যে অনেক চিন্তা ভিড় করে এল। হিন্দুধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধুদেরকে ইষ্টসিদ্ধির জন্য অনেক রকম শারীরিক নির্যাতন ভোগ করতে দেখেছি। প্রয়াগে কুম্ভমেলায়, কল্পবাস ব্রত পালনের সময় মাঘমেলায় আমি ঊর্ধবাহু, আকাশমুখী, পঞ্চধুনী, জলশয্যী প্রভৃতি নানা শ্রেণীর সাধু দেখেছি। গুদড়ী সম্প্রদায়ের সাধু সবসময় চলতে থাকেন, হয় পথে নতুবা একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে পদচালনা করতে করতে তাঁদের দুটো পা ফুলে গেছে তবুও হাঁটার ছন্দে তাঁদের পদচালনায় বিরাম নাই।

কেউ কেউ এক বা উভয় বাহুকে সতত উর্ধেই তুলে রাখেন। কেউ বা উপরের দিকে কোন গাছের ডালে পা দুটো বেঁধে রেখে অধোমস্তকে ঝুলতে থাকেন এবং মাথার নিচে অগ্নিকুণ্ড স্থাপন করেন। এঁদের নাম ঊর্ধমুখ তপস্বী।মেদিনীপুর জেলার ধলহারা গ্রামে 'পাগলী মা' বা গৌরীমা নামে একজন মহাসাধিকা ছিলেন। আমার জীবনে তিনিই প্রথম সাধু। তখন আমার বয়স মাত্র বার।আমাদের গ্রামবাসী পুঁটিরাম পাত্র নামে পাগলীমায়ের এক শিষ্যের সঙ্গে তাঁকে দর্শন করার জন্য বাবা আমাকে পাঠিয়েছিলেন।

গিয়ে দেখেছিলাম, বৈশাখ মাসের খর রৌদ্রে পাঁচ পাশে পাঁচটা অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেই যোগেশ্বরী মা পঞ্চতপা করছিলেন। তাঁর গুরু ভূষণানন্দজী ছিলেন ত্রাটক সিদ্ধ মহাযোগী।তিনি প্রতিদিনই সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সূর্যের দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন।কুম্ভমেলাতে কাউকে দেখেছি কাঁটার উপর শুয়ে আছেন, কেউ বা প্রচণ্ড শীতে গলা পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে সাধনা করে চলেছেন। এঁদের নাম জলশয্যী।অযোধ্যার সরযূতীরে এক মহাত্মার জল-তপস্যা দেখেছিলাম, একটি মাচার নিচে একটি খাদ, খাদটি জলপূর্ণ, তার মধ্যে তিনি গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে আছেন, মাচার উপর একটি ছিদ্রযুক্ত কলস, দুজন সেবক অহরহ সেই কলসে জল ঢালছেন,সেই জল সাধুর মাথার উপর গিয়ে পড়ছে। তিনি তন্ময় হয়ে ইষ্টনাম জপ করে চলেছেন।

পঞ্চধূনী বা পঞ্চতপার চেয়েও এই জল-তপস্যাকে কঠিনতর বলে মনে হয়েছিল।এখানে এই গুলজা গ্রামের ঠাড়েশ্বরী মহারাজকে দেখছি দিবারাত্র দণ্ডায়মান অবস্থায় নিজের সাধনায় মগ্ন আছেন। 
এইসব কথা ভাবতে ভাবতে নিজের মনে ধিক্কার জন্মাল।আমার পক্ষে ত কোন উগ্র তপস্যাই সম্ভব নয়। তাহলে আমার কি হবে? নর্মদেশ্বর শিবের উদ্দেশ্যে বললাম- প্রভু! তোমার কৃপালাভ করতে হলে এত যদি উৎকট উগ্র তপস্যার প্রয়োজন হয়, তাহলে তোমার নাম আশুতোষ কেন?

সূর্যাস্ত হচ্ছে, ধীরে ধীরে অন্ধকারের ঢল নামছে বিন্ধ্যপর্বতের সর্বত্র। আশ্রমে ফিরে এলাম, পাঁচ-ছয়জন মহিলা এসে আমলকীর ডালে প্রদীপ জ্বালিয়ে ঝুলিয়ে দিচ্ছেন।

বিন্ধ্যেশ্বরীজী ধূপ, দীপ এবং কর্পূর জ্বালিয়ে তাঁর গুরু ঠারেশ্বরী মহারাজের আরতি করতে করতে বলছেন----


আনন্দমানন্দকরং প্রসন্নং ঞ্জানস্বরূপং নিজবোধযুক্তম্‌।
যোগীন্দ্রমীড্যং ভবরোগবৈদ্যং শ্রীমদ্‌গুরুং নিত্যমহং ভজামি।।

ঠাড়েশ্বরীজীর দেহে মনে কোন চাঞ্চল্য নাই, বিকার নাই, কোন দিকে দৃকপাত করছেন না, তাঁর অপলক দৃষ্টি একইভাবে নর্মদার দিকে নিবদ্ধ রয়েছে।

আরতি শেষ হতেই মায়েরা চলে গেলেন। বিন্ধ্যেশ্বরীজী ঠাড়েশ্বরীজীকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন। আমিও প্রণাম করলাম। প্রণাম করে উঠে দাঁড়াতেই দেখলাম, তাঁর ডানহাতের তর্জনীটি আহ্বানের ভঙ্গীতে নড়ে উঠল,দৃষ্টি সেই একইভাবে নর্মদার দিকে, আমি তাঁর তর্জনীর ইঙ্গিত বুঝতে পারিনি, বিন্ধ্যেশ্বরীজী আমার গায়ে টোকা দিয়ে মহাত্মার কাছে এগিয়ে যেতে সংকেত করলেন। আমি তাঁর কুণ্ডলের কাছে এগিয়ে যেতেই তিনি মৃদুকণ্ঠে বলে উঠলেন---য়হু খালা কা ঘর নাঁহি। 

এই খণ্ডিত বাকাংশের মর্ম কিছু বুঝলাম না। বক্তার দৃষ্টিতে যদি কোন vibration or expression না থাকে তাহলে এমনিতেই বক্তব্য বিষয়ের রস বা ভাব উপলব্ধি করা যে কোন শ্রোতার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষতঃ এখানে তাঁর উচ্চারিত শব্দগুলি আংশিকভাবে উচ্চারিত হয়েছে, যার আক্ষরিক শব্দার্থ হল---এটা মাসীর বাড়ী নয়! হঠাৎ কোন কথা নাই বার্তা নাই, বিনা প্রসঙ্গে আচমকা তিনি এমন কথা কেন বললেন বুঝতে পারলাম না। আমি নীরবে দাঁড়িয়েই রইলাম।

এক মিনিট পরেই তিনি আবার মৃদুকণ্ঠে বলতে লাগলেন--- 


কবীর য়হু ঘর প্রেম কা,খালা কা ঘর নাঁহি।
সীস উতারৈ হাথি করি, সে পৈসে ঘর মাহিঁ।।
কবীর নিজ ঘর প্রেম কা মারগ অগম অগাধ।
সীস উতারি পগ তলি ধরৈ তব নিকটি প্রেম কা স্বাদ।।

অর্থাৎ নিজের হাতে মাথা কেটে হাতে নিয়ে প্রবেশ করতে হবে প্রভুর প্রেম-মন্দিরে।দুর্গম সেই পথ, অসীম তার বিস্তার।এ মাসীর বাড়ী নয় যে আবদার করলে আর চোখের জল ফেললেই যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যাবে!

মহাত্মা আর কিছু বললেন না---আগের মতই নীরব নিথর নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমরা কুটিরে ফিরে এলাম।বিন্ধ্যেশ্বরীজী আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলেন।কারণ, তাঁর গুরুদেব ক্কচিৎ কদাচিৎ কারও কারও সঙ্গে দু'একটি কথা বলেন বটে কিন্তু গত বিশ বৎসরের মধ্যে আমাকে নিয়ে মোট তিনজনের সঙ্গে কথা বলতে তিনি দেখলেন।কাজেই আমার মহাসৌভাগ্য। 

বিছানায় বসে নানা কথা ভাবতে লাগলাম।বিকেলে নর্মদার ঘাটে বসে পঞ্চতপা, জলতপা, উর্ধ্বপদ, হেঁটমুণ্ডে থাকা এবং দিন রাত্রি দাঁড়িয়ে থাকা প্রভৃতি তপস্যাকে আমি উৎকট এবং উগ্র ভেবে মনে মনে ভগবানের কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছিলাম যে এত কঠোর তপস্যা ছাড়া তোমাকে পাওয়া যাবে না, এই যদি তোমার বিধান হয় তাহলে তোমার আশুতোষ নাম কি মিথ্যা? বুঝতে পারলাম---ঠাড়েশ্বরী মহারাজ আজ সন্ধ্যায় তারই জবাব দিয়েছেন।বিন্ধ্যেশ্বরীজী আমাকে আগেই কথায় কথায় জানিয়েছেন যে আমি যেদিন সন্ধ্যায় এখানে এসে পৌঁছলাম সেদিনই মধ্যাহ্নে নাকি তাঁর গুরুদেব আমার আসার কথা পূর্বাহ্নেই জানিয়ে দিয়েছিলেন।মহাত্মা কি সত্যই অন্তর্যামী? 

হোন তিনি অন্তর্যামী, তবুও তাঁর ঐরমক তপস্যার উগ্রতাকে ভগবৎ প্রাপ্তির উপায় বলে সর্বান্তকরণে গ্রহণ করতে পারছিলাম না। আমার মনে হল, আপাতঃদৃষ্টিতে ঠারেশ্বরী মহারাজের ঐরকম বিচিত্র তপশ্চরণকে যতই কঠোর মনে হোক, এর মূলেও আছে ভগবানের প্রতি বিশুদ্ধ প্রেম।

প্রীতম প্রিয়তমের প্রতি আকুল-করা পাগল-করা সেই সব ভুলানো প্রেম ভাব না জন্মালে কি কোন মানুষের পক্ষে নরদেহ ধারণ করে এত কষ্ট সহ্য করা সম্ভব হয়? কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ভক্তিস্নিগ্ধ ভাষায় এই রকম অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, যার হৃদয়ে ভগবৎ প্রেমের আলো এসে পড়েছে---'তার বক্ষে বেদনা অপার, তার নিত্যজাগরণ'। 

যে ভগবানের প্রেমে বিভোর হয়, সেই ত জীবনে এবং আচরণে দেখাতে পারে, বলতে পারে---ওরে মন, ওরে আমার প্রিয়বন্ধু, বিবেচনা করে দেখ, প্রণয়ী হলে কি তার শোয়া চলে? সমুঝ দেখ মন মিত পিয়ারা আসিক হো কর্‌ শোনা ক্যা রে? 

ঠারেশ্বরী মহারাজের আমার শুকানো যোগীমাত্র বলে মনে হচ্ছে না, তিনিও আসিক।প্রেমিক বলেই তাঁর শোয়া বসা নাই। অপলক দৃষ্টিতে অহোরাত্র তাঁর প্রেমাস্পদের দিকেই তাকিয়ে আছেন। 

কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। যখন ঘুম ভাঙলো, তখন ভোর হয়ে আসছে। কম্বল মুড়ি দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ফাল্গুন মাস পড়ে গেলেও তখনও খুব শীত। কুশায়ার অন্ধকারে সব ঢেকে আছে।কৌতুহল বশে পা টিপে টিপে মহাত্মা যেখানে দাঁড়িয়ে সেখানে এলাম। তাঁর জটা এবং পরিধেয় গৈরিক বস্ত্রখণ্ড শিশির পড়ে ভিজে গেছে। তাঁর ডান দিকের এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, যাতে তিনি আমাকে দেখতে না পান। সহসা দক্ষিণ হস্তের তর্জনী কিঞ্চিৎ নড়ে উঠল। সন্ধ্যাবেলার মত এটাকে তর্জনী সংকেত মনে করে সাহসে ভর করে সামনে এসে দাঁড়ালাম। প্রায় দু'মিনিট পরে পূর্বের মতই মৃদুকণ্ঠে বলে উঠলেন---- 


প্রীতম্‌ হসনাঁ দূরি করি, করি রোবন সৌঁ চিত্ত।
বিন্‌ রোয়াঁ বস্তুঁ পাই এ প্রেম পিয়ারা মিত্ত।।
হঁসি হঁসি কান্ত ন পাইএ,জিন্‌ পায়া তিন্‌ রোই।
জো হাঁসে হী হরিমিলৈ তব্‌ নহীঁ দুহাগিন্‌ কোঈ।।

অর্থাৎ প্রিয়তম এমনিতর দুঃখের পথ দিয়েই আসেন। হাসতে হাসতে তাঁকে পাওয়া যায় না। যে তাঁকে পেয়েছে কাঁদতে কাঁদতেই পেয়েছে; দিন রাত তার চোখের জল ঝরছে, তবে প্রিয়তমের সঙ্গে তার মিলন ঘটেছে। হাসতে হাসতে যে হরিকে পেল তার মত দুর্ভাগা আর কেউ নাই।

আবার সব চুপচাপ। আমি ধীরে ধীরে তাঁর কাছ হতে সরে এলাম।

https://www.facebook.com/pages/tapobhuminarmada/454528151310191